...

ওবেসিটি বা স্থূলতা রোগের ইতিহাস

ওবেসিটি বা স্থূলতা রোগের ইতিহাস

স্থূলতা (Obesity) একটি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা মানব সভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান ছিল, তবে এর ব্যাপকতা এবং সংজ্ঞায়ন সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। এর ইতিহাসকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে:

. প্রাচীন সভ্যতায় স্থূলতা:

ক) সংরক্ষণ প্রাচুর্যের প্রতীক: প্রাচীনকালে, বিশেষত যখন খাদ্যের অভাব ছিল সাধারণ ঘটনা, তখন শরীরের অতিরিক্ত চর্বিকে প্রাচুর্য, উর্বরতা এবং স্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। মোটা হওয়া প্রায়শই উচ্চ সামাজিক অবস্থান এবং সমৃদ্ধির পরিচায়ক ছিল, কারণ কেবল ধনী ব্যক্তিরাই পর্যাপ্ত খাবার পেতে সক্ষম হতেন।

খ) শিল্প সাহিত্যে: প্রাচীন গ্রীস, রোম এবং মিশরের শিল্পকর্মে প্রায়শই স্থূলকায় ব্যক্তিদের চিত্রিত করা হয়েছে, যা তাদের সমাজে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান বা সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করত। উদাহরণস্বরূপ, ভেনাস অফ উইল্ডেনডর্ফ (Venus of Willendorf)-এর মতো প্রাগৈতিহাসিক মূর্তিগুলিতে স্থূল নারীকে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

গ) স্বাস্থ্যগত ধারণা: যদিও স্থূলতাকে প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, কিছু প্রাচীন সভ্যতা স্থূলতার স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন ছিল। হিপোক্রেটিস, প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসক, স্থূলতাকে একটি রোগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং এর সাথে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক লক্ষ্য করেছিলেন।

. মধ্যযুগ রেনেসাঁস:

ক) খাদ্যের সহজলভ্যতা: মধ্যযুগে এবং রেনেসাঁসের সময়কালে, খাদ্যের সহজলভ্যতা কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক স্তরের মধ্যে বৃদ্ধি পায়, বিশেষত অভিজাত এবং ধনী শ্রেণীর মধ্যে। ফলে এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে স্থূলতার প্রবণতা দেখা যায়।

খ) ধর্মীয় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: এই সময়ে, স্থূলতা বা অতিভোজনকে অনেক সময় পাপ বা দুর্বলতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হতো, বিশেষত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। তবে, এটি সমাজের সকল স্তরে ব্যাপক সমস্যা ছিল না, কারণ বেশিরভাগ মানুষই শারীরিক পরিশ্রম করত এবং পর্যাপ্ত খাবার পেত না।

. শিল্প বিপ্লবের পর স্থূলতার বৃদ্ধি (১৯শ২০শ শতাব্দী):

ক) খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ: শিল্প বিপ্লবের ফলে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটে। এতে করে ক্যালরি-ঘন, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং চিনিযুক্ত পানীয় সহজলভ্য ও সস্তা হয়ে ওঠে।

খ) শ্রমের প্রকৃতিতে পরিবর্তন: শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমে আসে। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের ফলে অনেক মানুষ কারখানায় বা অফিসে বসে কাজ করা শুরু করে, যা শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

গ) নগরায়ন: নগরায়নের ফলে শহরের জীবনযাত্রা আরও আসীন (sedentary) হয়ে ওঠে। হেঁটে চলার বা খেলাধুলার সুযোগ কমে যায় এবং যাতায়াতের জন্য যানবাহন ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

ঘ) বিশ্বব্যাপী বিস্তার: একসময় স্থূলতাকে মূলত উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর সমস্যা বলে মনে করা হলেও, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই এর হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, বিশেষত নগর জীবনে।

. আধুনিক যুগ (বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বর্তমান):

ক) মহামারীর রূপ: বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে স্থূলতা একটি বৈশ্বিক মহামারীর রূপ ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

খ) কারণসমূহের জটিলতা: আধুনিক যুগে স্থূলতার কারণগুলো অত্যন্ত জটিল। এতে জিনগত প্রবণতা, পরিবেশগত কারণ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানসিক চাপ (stress) সম্মিলিতভাবে ভূমিকা পালন করে।

গ) ফাস্ট ফুড প্রক্রিয়াজাত খাদ্য: ফাস্ট ফুড এবং উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এবং ব্যাপক বিজ্ঞাপন আধুনিক স্থূলতার অন্যতম প্রধান কারণ।

ঘ) ডিজিটাল জীবনযাত্রা: ডিজিটাল বিনোদন, কম্পিউটার ও মোবাইল ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহার এবং বাড়িতে বসে কাজ করার প্রবণতা মানুষের শারীরিক কার্যকলাপকে আরও কমিয়ে দিয়েছে।

ঙ) স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা: আধুনিক যুগে স্থূলতার মারাত্মক স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। হৃদরোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, কিছু ধরনের ক্যান্সার এবং জয়েন্টের সমস্যার মতো রোগের সাথে স্থূলতার সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছে।

স্থূলতার ইতিহাস মানব সমাজের বিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় যা প্রাচুর্যের প্রতীক ছিল, আজ তা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত।

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.