...

কিডনির (নেফ্রোটিক সিনড্রোম Nephrotic Syndrome)

কিডনির (নেফ্রোটিক সিনড্রোম Nephrotic Syndrome):

নেফ্রোটিক সিনড্রোম হলো কিডনির একটি অবস্থা যেখানে কিডনির ফিল্টারিং ইউনিট (গ্লোমেরুলি) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে প্রস্রাবের মাধ্যমে অত্যধিক প্রোটিন, বিশেষ করে অ্যালবুমিন, নির্গত হয়। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়, যা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১) প্রস্রাবে অত্যধিক প্রোটিন নির্গমন (প্রোটিনুরিয়া): এটি নেফ্রোটিক সিনড্রোমের মূল বৈশিষ্ট্য। সাধারণত, কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে প্রস্রাব তৈরি করে, কিন্তু প্রোটিনকে রক্তে ধরে রাখে। যখন কিডনির গ্লোমেরুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তারা প্রোটিনকে প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়। এর ফলে প্রস্রাব ফেনাযুক্ত হতে পারে।

২) শরীরে ফোলাভাব (শোথ বা এডিমা): প্রোটিন, বিশেষ করে অ্যালবুমিন, রক্তে তরল ধরে রাখতে সাহায্য করে। যখন শরীর থেকে অতিরিক্ত প্রোটিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়, তখন রক্তে প্রোটিনের মাত্রা কমে যায় (হাইপোঅ্যালবুমিনেমিয়া)। এর ফলে রক্তনালী থেকে তরল টিস্যুতে বেরিয়ে আসে এবং শরীরে ফোলাভাব সৃষ্টি হয়। এই ফোলাভাব সাধারণত মুখ (বিশেষ করে চোখের চারপাশে), হাত, পা এবং গোড়ালিতে বেশি দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে পেটেও পানি জমতে পারে (অ্যাসাইটিস)।

৩) উচ্চ কোলেস্টেরল (হাইপারলিপিডেমিয়া): রক্তে প্রোটিনের মাত্রা কমে গেলে লিভার ক্ষতিপূরণমূলকভাবে কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মতো চর্বি উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এর কারণ হলো, রক্তে প্রোটিনের অভাবে শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হয় এবং লিভার সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে। এর ফলে উচ্চ কোলেস্টেরল নেফ্রোটিক সিনড্রোমের একটি সাধারণ লক্ষণ।

৪) উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): যদিও নেফ্রোটিক সিনড্রোমের সব রোগীর উচ্চ রক্তচাপ থাকে না, তবে কিছু ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি এবং তরল ধরে রাখার কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হলে শরীরের তরল ও লবণ ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটে, যা রক্তচাপ বাড়াতে পারে।

অন্যান্য লক্ষণ:

খ) ওজন বৃদ্ধি: শরীরে তরল জমে থাকার কারণে রোগীর ওজন বাড়তে পারে।

খ) ক্লান্তিবোধ দুর্বলতা: প্রোটিনের ক্ষতি এবং কিডনির অতিরিক্ত কাজের চাপ ক্লান্তি ও দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে।

গ) ক্ষুধামন্দা: অনেক রোগীর ক্ষুধা কমে যেতে পারে।

ঘ) রক্ত জমাট বাঁধা: কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা রক্ত জমাট বাঁধাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোও প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে। এর ফলে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ঙ) সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কিত কিছু প্রোটিনও প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে, যা সংক্রমণ (ইনফেকশন) হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

চ) অপুষ্টি রক্তাল্পতা: প্রোটিনের অভাবে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে রক্তাল্পতাও (রক্তে লোহিত রক্তকণিকা কমে যাওয়া) হতে পারে।

নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ:

নেফ্রোটিক সিনড্রোম বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর প্রধান কারণগুলো হলো-

ক) প্রাথমিক কিডনি রোগ: কিছু কিডনি রোগ সরাসরি কিডনির গ্লোমেরুলিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

খ) মিনিমাল চেঞ্জ ডিজিজ (Minimal Change Disease – MCD): শিশুদের মধ্যে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। মাইক্রোস্কোপের নিচে কিডনির কোনো গুরুতর ক্ষতি দেখা যায় না, তবে ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরা পড়ে।

গ) ফোকাল সেগমেন্টাল গ্লোমেরুলোস্ক্লেরোসিস (Focal Segmental Glomerulosclerosis – FSGS): এই রোগে কিডনির গ্লোমেরুলির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঘ) মেমব্রানাস নেফ্রোপ্যাথি (Membranous Nephropathy): এটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নেফ্রোটিক সিনড্রোমের একটি সাধারণ কারণ, যেখানে গ্লোমেরুলিতে অ্যান্টিবডির জমাট বাঁধে।

ঙ) অন্যান্য রোগ (সেকেন্ডারি কারণ): কিছু অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ হতে পারে, যেমন:

চ) ডায়াবেটিস নেফ্রোপ্যাথি: দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষতি করে নেফ্রোটিক সিনড্রোম ঘটাতে পারে।

ছ) লুপাস (Systemic Lupus Erythematosus – SLE): এটি একটি অটোইমিউন রোগ যা কিডনি সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।

জ) অ্যামাইলয়েডোসিস (Amyloidosis): শরীরে অস্বাভাবিক প্রোটিন জমাট বাঁধলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঝ) সংক্রমণ: কিছু সংক্রমণ, যেমন হেপাটাইটিস বি, সি এবং এইচআইভি, নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ হতে পারে।

ট) কিছু ঔষধ: কিছু ঔষধ কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

ঠ) ক্যান্সার: কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সারও নেফ্রোটিক সিনড্রোম ঘটাতে পারে।

চিকিৎসা:

নেফ্রোটিক সিনড্রোমের চিকিৎসা নির্ভর করে এর কারণের ওপর। চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো-

(১) প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গমন কমানো:

ক) স্টেরয়েড (Prednisolone): এটি নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে মিনিমাল চেঞ্জ ডিজিজের জন্য।

খ) ইমিউনোসাপ্রেসিভ ঔষধ (যেমন Tacrolimus, Cyclosporine, Mycophenolate Mofetil, Rituximab): স্টেরয়েডে কাজ না করলে বা স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হলে এই ঔষধগুলো ব্যবহার করা হয়।

গ) ACE Inhibitors বা ARBs: এই ঔষধগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং প্রস্রাবে প্রোটিনের নির্গমন কমায়।

(২) ফোলাভাব কমানো:

ক) মূত্রবর্ধক ঔষধ (Diuretics): শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে দিতে সাহায্য করে।

খ) লবণ নিয়ন্ত্রণ: খাবারে লবণ কম খেলে ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।

(৩) উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ:

ক) স্ট্যাটিন (Statins): কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর জন্য এই ঔষধগুলো ব্যবহার করা হয়।

(৪) উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ:

ক) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ঔষধ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

(৫) রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ:

ক) কিছু ক্ষেত্রে রক্ত ​​পাতলা করার ঔষধ (Anticoagulants) দেওয়া হতে পারে।

(৬) অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা:

ক) পুষ্টি: প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

খ) সংক্রমণ প্রতিরোধ: যেহেতু সংক্রমণ একটি ঝুঁকি, তাই সঠিক সময়ে টিকা নেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সতর্ক থাকা জরুরি।

নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি জটিল অবস্থা, তবে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এটিকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিশুদের ক্ষেত্রে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্টেরয়েড চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার ধরন ভিন্ন হতে পারে। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ অনুসরণ করা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা এই রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.