...

নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন

নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন (Neurally Mediated Hypotension – NMH) বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ (Vasovagal Syncope)

নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন (NMH), যা সাধারণত ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ নামে পরিচিত, হলো এক ধরনের নিম্ন রক্তচাপ যা নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের (Autonomic Nervous System) অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ঘটে। এটি প্রায়শই শিশুদের এবং অল্পবয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারে। এই অবস্থায়, রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায় এবং মস্তিষ্ক সহ অন্যান্য অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার ফলে ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

NMH বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ কী?

সাধারণ পরিস্থিতিতে, আমাদের স্নায়ুতন্ত্র রক্তচাপ এবং হৃৎপিণ্ডের গতি নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে। তবে, NMH-এর ক্ষেত্রে, কিছু উদ্দীপকের প্রতিক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্র ভুল সংকেত পাঠায়। এর ফলে:

১. হৃৎপিণ্ডের গতি কমে যায়: ভেগাস স্নায়ুর (Vagus Nerve) অতি-সক্রিয়তার কারণে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন ধীর হয়ে যায়।

২. রক্তনালী প্রসারিত হয় (ভাসোডাইলেশন): শরীরের রক্তনালীগুলো, বিশেষ করে পায়ের রক্তনালীগুলো হঠাৎ করে প্রসারিত হয়ে যায়।

এই দুটি প্রতিক্রিয়ার মিলিত ফলস্বরূপ হৃৎপিণ্ড মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং রক্ত পায়ের দিকে জমা হতে শুরু করে, যার ফলে রক্তচাপ দ্রুত কমে যায়। যখন মস্তিষ্কে রক্তের সরবরাহ কমে যায়, তখন ব্যক্তি জ্ঞান হারাতে পারে।

কারণসমূহ ট্রিগার (Triggers)

NMH বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপের সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় নির্ণয় করা কঠিন, তবে কিছু সাধারণ উদ্দীপক বা ট্রিগার চিহ্নিত করা হয়েছে যা এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে:

১. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা: বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বা জনাকীর্ণ স্থানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে রক্ত পায়ের দিকে জমা হতে পারে, যা NMH-এর ঝুঁকি বাড়ায়।

২. তীব্র আবেগপ্রবণতা: প্রচণ্ড ভয়, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বা হঠাৎ খারাপ খবর শুনলে স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

৩. বেদনা: তীব্র শারীরিক ব্যথা, যেমন রক্ত নেওয়ার সময় বা ইনজেকশন দেওয়ার সময়।

৪. নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক কার্যকলাপ: কাশি, প্রস্রাব করা বা মলত্যাগ করার সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে।

৫. রক্ত দেখা: রক্ত দেখলে কিছু মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

৬. ডিহাইড্রেশন (Dehydration): শরীরে পানির অভাব হলে রক্তের পরিমাণ কমে যায়, যা রক্তচাপের আকস্মিক পতন ঘটাতে পারে।

৭. গরম আবহাওয়া: শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে রক্তনালী প্রসারিত হয়, যা NMH-এর ঝুঁকি বাড়ায়।

৮. ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এই অবস্থার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

লক্ষণসমূহ

ভাসোভ্যাগাল সিনকোপের লক্ষণগুলো সাধারণত অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগে দেখা যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে অজ্ঞান হওয়ার পরেও কিছুক্ষণ থাকতে পারে:

১. মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা ব্যথা: এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ।

২. দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া: চোখের সামনে অন্ধকার দেখা বা ঝাপসা লাগা।

৩. বমি বমি ভাব বা বমি: অসুস্থ লাগতে পারে।

৪. ঘাম: হঠাৎ করে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।

৫. ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া: চামড়া ফ্যাকাসে বা নীলচে হয়ে যাওয়া।

৬. ক্লান্তি বা দুর্বলতা: শরীর দুর্বল বা অবসাদগ্রস্ত লাগা।

৭. ঠান্ডা ভেজা অনুভূতি: চামড়া ঠান্ডা ও চটচটে লাগতে পারে।

৮. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিটের জন্য জ্ঞান হারানো।

অজ্ঞান হওয়ার পর, ব্যক্তি সাধারণত দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে কিছুক্ষণ দুর্বল বা বিভ্রান্ত বোধ করতে পারে।

রোগ নির্ণয় চিকিৎসা

NMH বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস শোনেন এবং শারীরিক পরীক্ষা করেন। কিছু ক্ষেত্রে, রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি (ECG), বা টিল্ট টেবিল টেস্ট (Tilt Table Test)-এর মতো পরীক্ষা করা হতে পারে। টিল্ট টেবিল টেস্টে, রোগীকে একটি টেবিলে শুইয়ে ধীরে ধীরে টেবিলটিকে খাড়া করা হয় এবং এই সময় রক্তচাপ ও হৃৎপিণ্ডের গতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতি সাধারণত লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধের উপর জোর দেয়:

১. ট্রিগার পরিহার: যেসব পরিস্থিতিতে NMH ঘটে, সেগুলো এড়িয়ে চলা। যেমন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এড়ানো বা রক্ত দেখলে অন্য দিকে তাকানো।

২. প্রচুর পরিমাণে পানি পান: পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. লবণ গ্রহণ: কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক লবণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন (তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে, বিশেষ করে যদি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে)।

৪. নির্দিষ্ট শারীরিক কৌশল: অজ্ঞান হওয়ার আগে যখন লক্ষণগুলো দেখা যায়, তখন কিছু কৌশল অবলম্বন করে জ্ঞান হারানো এড়ানো যেতে পারে। যেমন, পা ক্রস করে শক্ত করে পেশী সংকুচিত করা, হাতের মুঠো শক্ত করে ধরা, বা হাঁটু গেড়ে বসা। এই কৌশলগুলো মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে।

৫. ঔষধ: যদি জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কাজ না হয় এবং অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটে, তবে কিছু ওষুধ যেমন বিটা-ব্লকার বা ফ্লুড্রোকর্টিসোন (Fludrocortisone) ব্যবহার করা যেতে পারে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

NMH বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে এর ফলে অজ্ঞান হয়ে গেলে আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে। তাই, আপনার বা আপনার পরিচিত কারো মধ্যে যদি এমন লক্ষণ দেখা যায়, তবে একজন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা জরুরি।

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.