পুরুষ বন্ধ্যাত্বের (শুক্রাণু-সম্পর্কিত সমস্যা Sperm-related issues)
পুরুষ বন্ধ্যাত্বের (শুক্রাণু–সম্পর্কিত সমস্যা Sperm-related issues)
শুক্রাণু-সম্পর্কিত সমস্যা (Sperm-related issues) পুরুষ বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। বীর্য বিশ্লেষণ (semen analysis) পরীক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো ধরা পড়ে। নিচে এই সমস্যাগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা:
১. কম শুক্রাণু উৎপাদন (Oligospermia)
সংজ্ঞা: যখন একজন পুরুষের বীর্যে প্রতি মিলিলিটারে শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে অলিগোস্পার্মিয়া (Oligospermia) বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মান অনুযায়ী, প্রতি মিলিলিটার বীর্যে ১৫ মিলিয়ন (১.৫ কোটি) বা তার বেশি শুক্রাণু থাকলে তা স্বাভাবিক ধরা হয়। এর কম হলে তাকে কম শুক্রাণু উৎপাদন হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রকারভেদ: অলিগোস্পার্মিয়ার মাত্রা বিভিন্ন হতে পারে:
ক) হালকা (Mild Oligospermia): প্রতি মিলিলিটারে ১০-১৫ মিলিয়ন শুক্রাণু।
খ) মাঝারি (Moderate Oligospermia): প্রতি মিলিলিটারে ৫-১০ মিলিয়ন শুক্রাণু।
গ) তীব্র (Severe Oligospermia): প্রতি মিলিলিটারে ৫ মিলিয়নেরও কম শুক্রাণু।
কারণ:
ক) ভেরিকোসিল (Varicocele): অণ্ডকোষের শিরাগুলো ফুলে যাওয়া, যা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং শুক্রাণু উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। এটি অলিগোস্পার্মিয়ার সবচেয়ে সাধারণ চিকিৎসাযোগ্য কারণ।
খ) হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: পিটুইটারি গ্রন্থি বা হাইপোথ্যালামাসের সমস্যা, যা শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন (যেমন – FSH, LH, টেস্টোস্টেরন) উৎপাদনে বাধা দেয়।
গ) জীবনযাত্রার মান: অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত চাপ, এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের ব্যবহার।
ঘ) সংক্রমণ: কিছু সংক্রমণ, যেমন – মাম্পস বা গনোরিয়া, অণ্ডকোষ বা প্রোস্টেটে প্রদাহ সৃষ্টি করে শুক্রাণু উৎপাদন কমাতে পারে।
২. শুক্রাণুর গতিশীলতার অভাব (Asthenozoospermia)
সংজ্ঞা: এই অবস্থায় শুক্রাণুর নড়াচড়ার বা সাঁতার কাটার ক্ষমতা কমে যায়। নিষিক্তকরণের জন্য শুক্রাণুকে নারীর প্রজনন নালীর ভেতর দিয়ে ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে হয়। যদি শুক্রাণু সঠিকভাবে চলাচল করতে না পারে, তবে ডিম্বাণু নিষিক্ত করার সম্ভাবনা কমে যায়।
প্রকারভেদ: গতিশীলতার অভাবের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুসারে, যদি শুক্রাণুর ৪০% এর কম গতিশীল থাকে, তবে তাকে অ্যাস্থেনোজোস্পার্মিয়া বলা হয়।
কারণ:
ক) জেনেটিক ত্রুটি: শুক্রাণুর লেজ বা গতিশীলতা নিয়ন্ত্রণকারী গঠনের জন্মগত ত্রুটি।
খ) সংক্রমণ: পুরুষ প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ শুক্রাণুর গতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
গ) অ্যান্টি-স্পার্ম অ্যান্টিবডি: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত শুক্রাণুকে ক্ষতিকারক মনে করে আক্রমণ করে।
ঘ) ভেরিকোসিল: এটি শুক্রাণুর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি তাদের গতিশীলতাও কমিয়ে দেয়।
ঙ) জীবনযাত্রার অভ্যাস: অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করা (যেমন – ল্যাপটপ কোলে নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করা), অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা বা টাইট পোশাক পরা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা শুক্রাণুর গতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
৩. শুক্রাণুর অস্বাভাবিক আকার (Teratozoospermia)
সংজ্ঞা: এই অবস্থায় শুক্রাণুর আকার বা আকৃতি অস্বাভাবিক থাকে। একটি সুস্থ শুক্রাণুর একটি ডিম্বাকৃতি মাথা (head), একটি পরিষ্কার মধ্যভাগ (midpiece) এবং একটি লেজ (tail) থাকে। যদি শুক্রাণুর মাথা, মধ্যভাগ বা লেজে কোনো ত্রুটি থাকে, তবে সেগুলোকে অস্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়।
গুরুত্ব: শুক্রাণুর সঠিক আকার ডিম্বাণুর ভেতরের দিকে প্রবেশ করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাভাবিক আকৃতির শুক্রাণু ডিম্বাণুর বাইরের স্তর ভেদ করতে পারে না, ফলে নিষিক্তকরণ সম্ভব হয় না।
প্রকারভেদ: অস্বাভাবিক আকৃতির শতাংশের ওপর নির্ভর করে টেরাটোজোস্পার্মিয়াকে হালকা, মাঝারি বা গুরুতর হিসেবে ভাগ করা হয়।
কারণ:
ক) জেনেটিক্স: কিছু জেনেটিক কারণ শুক্রাণুর গঠনে প্রভাব ফেলে।
খ) অতিরিক্ত চাপ: দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শুক্রাণুর গুণগত মান কমাতে পারে।
গ) ভিটামিনের অভাব: কিছু পুষ্টি উপাদানের অভাব (যেমন – জিঙ্ক, ভিটামিন) শুক্রাণুর গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘ) অতিরিক্ত জ্বর বা সংক্রমণ: উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শুক্রাণু সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঙ) ভেরিকোসিল: এটিও শুক্রাণুর আকার নষ্ট করতে পারে।
৪. বীর্যে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি (Azoospermia)
সংজ্ঞা: এটি পুরুষ বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে গুরুতর রূপ, যেখানে বীর্যে কোনো শুক্রাণু থাকে না। বীর্য বিশ্লেষণ করার পর যদি কোনো শুক্রাণু পাওয়া না যায়, তবে এই রোগ ধরা পড়ে।
প্রকারভেদ:
ক) অবরোধজনিত অ্যাজোস্পার্মিয়া (Obstructive Azoospermia): এই ক্ষেত্রে অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু শুক্রাণু বহনকারী নালীতে (যেমন – ভাস ডিফারেন্স) কোনো বাধার কারণে সেগুলো বীর্যের সাথে মিশতে পারে না। এই বাধা জন্মগত ত্রুটি, সংক্রমণ (যেমন – গনোরিয়া) বা পূর্বের কোনো অস্ত্রোপচারের কারণে হতে পারে (যেমন – ভ্যাসেকটমি)।
খ) অবরোধবিহীন অ্যাজোস্পার্মিয়া (Non-obstructive Azoospermia): এই ক্ষেত্রে অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন হয় না বা খুব কম হয়। এর কারণগুলো হলো:
(১) জেনেটিক কারণ: যেমন – ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম।
(২) হরমোনের সমস্যা: হরমোন উৎপাদনে গুরুতর ঘাটতি।
(৩) অণ্ডকোষের ক্ষতি: আঘাত, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি বা সংক্রমণ থেকে অণ্ডকোষের স্থায়ী ক্ষতি।
এই সমস্যাগুলো নির্ণয় করার জন্য একজন উর্বরতা বিশেষজ্ঞ (Fertility Specialist) বা ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া এবং বিভিন্ন পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।