...

(মেসোথেলিওমা Mesothelioma) আক্রমণাত্মক ক্যান্সার

মেসোথেলিওমা

মেসোথেলিওমা হলো একটি বিরল এবং আক্রমণাত্মক ক্যান্সার যা মেসোথেলিয়াম নামক টিস্যুর পাতলা স্তরে তৈরি হয়। এই মেসোথেলিয়াম শরীরের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গকে আবৃত করে রাখে, যেমন ফুসফুস, পেট, এবং হৃদপিণ্ড।

মেসোথেলিয়ামের কাজ

মেসোথেলিয়াম এক ধরনের রক্ষাকারী আস্তরণ হিসেবে কাজ করে, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ার সময় ঘর্ষণ রোধ করতে সাহায্য করে। এই আস্তরণের মধ্যে এক ধরনের তরল থাকে যা অঙ্গগুলোকে একে অপরের সাথে মসৃণভাবে স্লাইড করতে সাহায্য করে।

মেসোথেলিওমা কিভাবে হয়?

মেসোথেলিওমার প্রধান এবং প্রায় একমাত্র কারণ হলো অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসা। অ্যাসবেস্টস হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ যা অতীতে নির্মাণ শিল্প, নিরোধক (insulation) এবং অন্যান্য শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। যখন অ্যাসবেস্টসের সূক্ষ্ম আঁশগুলো নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে অথবা খাওয়ার মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে যায়, তখন সেগুলো মেসোথেলিয়ামে জমা হতে পারে। সময়ের সাথে সাথে, এই আঁশগুলো কোষগুলোতে প্রদাহ এবং জেনেটিক ক্ষতি সৃষ্টি করে, যা ক্যান্সার সৃষ্টি করে। মেসোথেলিওমা সাধারণত অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসার বহু বছর (২০-৫০ বছর) পর প্রকাশ পায়।

অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:

১) জেনেটিক প্রবণতা: কিছু ব্যক্তির মেসোথেলিওমাতে জিনগত সংবেদনশীলতা থাকতে পারে।

২) বিকিরণের সংস্পর্শ: বুক বা পেটে পূর্ববর্তী বিকিরণ থেরাপি (radiation therapy) ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৩) কেওলাইটস: রাসায়নিকভাবে অ্যাসবেস্টসের সাথে সম্পর্কিত কিছু খনিজ পদার্থ, যেমন এরিওনাইট, ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

মেসোথেলিওমার প্রকারভেদ সাধারণ অবস্থান

মেসোথেলিওমা সাধারণত যে অঙ্গের আস্তরণকে প্রভাবিত করে তার উপর ভিত্তি করে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়:

১) প্লুরাল মেসোথেলিওমা (Pleural Mesothelioma): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার, যা ফুসফুসের বাইরের আস্তরণ (প্লুরা) প্রভাবিত করে। প্রায় ৮০% মেসোথেলিওমা এই ধরনের হয়।

২) পেরিটোনিয়াল মেসোথেলিওমা (Peritoneal Mesothelioma): এটি পেটের ভেতরের আস্তরণ (পেরিটোনিয়াম) প্রভাবিত করে। এটি দ্বিতীয় সবচেয়ে সাধারণ প্রকার।

৩) পেরিকার্ডিয়াল মেসোথেলিওমা (Pericardial Mesothelioma): এটি হৃদপিণ্ডের চারপাশের আস্তরণ (পেরিকার্ডিয়াম) প্রভাবিত করে। এটি অত্যন্ত বিরল।

৪) টেস্টিকুলার মেসোথেলিওমা (Testicular Mesothelioma): এটি অণ্ডকোষের আস্তরণ (টিউনিকা ভ্যাজাইনালিস) প্রভাবিত করে। এটিও অত্যন্ত বিরল।

লক্ষণ

মেসোথেলিওমার লক্ষণগুলো টিউমারের অবস্থান এবং পর্যায় (stage) এর উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। যেহেতু এটি সাধারণত দেরিতে ধরা পড়ে, তাই অনেক সময় লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকাশ পায় না।

প্লুরাল মেসোথেলিওমার লক্ষণ:

১) বুকে ব্যথা: বুকের একপাশে বা নিচের পিঠে ব্যথা হতে পারে।

২) শ্বাসকষ্ট: প্লুরার মধ্যে তরল জমে যাওয়া (প্লুরাল ইফিউশন) অথবা টিউমারের বৃদ্ধির কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।

৩) অবিরাম কাশি: দীর্ঘস্থায়ী এবং শুষ্ক কাশি।

৪) অবসাদ: চরম ক্লান্তি।

৫) অকারণ ওজন হ্রাস: কোনো চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।

৬) ক্ষুধামন্দা: খাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়া।

৭) বুকে বা বাহুতে ফোলা: কখনও কখনও মুখের বা বাহুর ফোলা দেখা যেতে পারে।

পেরিটোনিয়াল মেসোথেলিওমার লক্ষণ:

১) পেটে ব্যথা ফুলে যাওয়া: পেটে তরল জমা হওয়ার কারণে (অ্যাসাইটিস) পেট ফুলে যেতে পারে।

২) বমি বমি ভাব বমি: হজমতন্ত্রে বাধার কারণে হতে পারে।

৩) অন্ত্রের অভ্যাসের পরিবর্তন: ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

৪) অকারণ ওজন হ্রাস: কোনো চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।

পেরিকার্ডিয়াল মেসোথেলিওমার লক্ষণ:

ক) বুকে ব্যথা

খ) শ্বাসকষ্ট

গ) হৃদস্পন্দন (পালপিটেশন)

ঘ) অবসাদ

রোগ নির্ণয়

মেসোথেলিওমা নির্ণয় করা বেশ কঠিন হতে পারে, কারণ এর লক্ষণগুলো অন্যান্য সাধারণ রোগের সাথে মিলে যেতে পারে। রোগ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত একাধিক ধাপের প্রয়োজন হয়:

১. শারীরিক পরীক্ষা ইতিহাস: ডাক্তার রোগীর সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ইতিহাস এবং অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস জানতে চাইবেন।

২. ইমেজিং পরীক্ষা:

১) বুকের এক্স-রে (X-ray): প্লুরাতে অস্বাভাবিকতা বা তরল জমা হয়েছে কিনা তা দেখাতে পারে।

২) সিটি স্ক্যান (CT Scan): ফুসফুস, পেট বা অন্যান্য আক্রান্ত এলাকার বিস্তারিত ছবি প্রদান করে।

৩) এমআরআই (MRI): টিউমারের বিস্তার এবং কাছাকাছি টিস্যুর সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

৪) পিইটি স্ক্যান (PET Scan): ক্যান্সার কোষগুলোর বিপাকীয় কার্যকলাপ পরিমাপ করে এবং শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার ছড়িয়েছে কিনা তা দেখতে সাহায্য করে।

৩. বায়োপসি (Biopsy): মেসোথেলিওমা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো বায়োপসি। আক্রান্ত টিস্যুর একটি ছোট নমুনা সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। বায়োপসি বিভিন্ন পদ্ধতিতে করা যেতে পারে, যেমন:

ক) নিডেল বায়োপসি: চামড়ার মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম সুচ প্রবেশ করিয়ে টিস্যু বা তরল সংগ্রহ করা।

খ) থোরাকোস্কোপি (Thoracoscopy) বা ল্যাপারোস্কোপি (Laparoscopy): একটি ছোট ছিদ্র করে ক্যামেরা ও যন্ত্রপাতি প্রবেশ করিয়ে সরাসরি আক্রান্ত স্থান থেকে টিস্যু সংগ্রহ করা।

গ) টিউমার মার্কার পরীক্ষা: রক্তে কিছু প্রোটিনের মাত্রা (যেমন মেসোথেলিন) পরিমাপ করা যেতে পারে, যা মেসোথেলিওমার সাথে যুক্ত থাকতে পারে।

চিকিৎসা

মেসোথেলিওমার চিকিৎসা টিউমারের ধরন, পর্যায়, রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্য এবং ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তার উপর নির্ভর করে। এটি একটি আক্রমণাত্মক ক্যান্সার হওয়ায়, নিরাময় প্রায়শই কঠিন হয়, তবে চিকিৎসা লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে।

সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:

১. সার্জারি (Surgery): যদি ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে এবং সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা সম্ভব হয়, তাহলে সার্জারি একটি বিকল্প হতে পারে।

ক) এক্সট্রাপ্লুরাল নিউমোনেকটোমি (Extrapleural Pneumonectomy): একটি ফুসফুস, প্লুরা, ডায়াফ্রামের অংশ এবং হৃদপিণ্ডের চারপাশের আস্তরণের অংশ অপসারণ করা হয়।

খ) প্লুরেক্টমি/ডেকোরটিকেশন (Pleurectomy/Decortication): ফুসফুসের আস্তরণ এবং বুকের ভেতরের দিকের আস্তরণ অপসারণ করা হয়।

গ) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটি সার্জারির আগে (টিউমার ছোট করতে) বা পরে (অবশিষ্ট কোষ ধ্বংস করতে) দেওয়া যেতে পারে। সিসপ্ল্যাটিন (Cisplatin) এবং পেমেট্রেক্সড (Pemetrexed) হলো মেসোথেলিওমার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ কেমোথেরাপির ওষুধ।

ঘ) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। এটি সার্জারির পর অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলতে অথবা ব্যথা ও অন্যান্য লক্ষণ কমাতে ব্যবহার করা হয়।

ঙ) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): এই চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করা হয়। নিভোলুমাব (Nivolumab) এবং ইপিলিমুমাব (Ipilimumab)-এর মতো ওষুধগুলি মেসোথেলিওমার চিকিৎসায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

চ) লক্ষ্যযুক্ত থেরাপি (Targeted Therapy): এই ধরনের ওষুধ ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট দুর্বলতাগুলোকে লক্ষ্য করে কাজ করে। মেসোথেলিওমার জন্য নতুন টার্গেটেড থেরাপি নিয়ে গবেষণা চলছে।

মেসোথেলিওমা একটি গুরুতর রোগ, তবে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীর জীবনকাল বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব। যদি অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শে আসার কোনো ইতিহাস থাকে এবং উপরে উল্লিখিত কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.