...

লো প্রেসার রোগের ধরন কি কি

লো প্রেসার রোগের ধরন কি কি

নিম্ন রক্তচাপ বা হাইপোটেনশন হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। সাধারণত, যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির রক্তচাপ ৯০/৬০ mmHg-এর নিচে নেমে আসে, তখন তাকে নিম্ন রক্তচাপ বা লো প্রেসার বলা হয়। উচ্চ রক্তচাপের মতো এটিও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি মস্তিষ্কে, হার্টে বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করে।

নিম্ন রক্তচাপের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যা এর কারণ এবং কখন রক্তচাপ কমে যায় তার উপর নির্ভর করে। প্রধান ধরনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

. অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বা পোস্টুরাল হাইপোটেনশন (Postural Hypotension):

এটি নিম্ন রক্তচাপের সবচেয়ে সাধারণ ধরন। যখন কেউ বসে থাকা বা শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ায়, তখন এই ধরনের হাইপোটেনশন দেখা যায়। এর কারণ হলো, হঠাৎ করে দাঁড়ানোর সময় মাধ্যাকর্ষণের কারণে রক্ত পায়ের দিকে চলে যায়, যা মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করে। সাধারণত, শরীর দ্রুত এই চাপ কমে যাওয়াকে পূরণ করে নেয়, কিন্তু যাদের অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য রক্ষা হয় না।

ক) লক্ষণ: মাথা ঘোরা, হালকা মাথা ব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি, ভারসাম্যহীনতা, দুর্বলতা এবং কখনও কখনও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

খ) কারণ: ডিহাইড্রেশন, দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকা, কিছু ঔষধ (যেমন – উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ, বিষণ্ণতার ঔষধ), স্নায়ুর সমস্যা, পার্কিনসন্স রোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি।

. পোস্টপ্রান্ডিয়াল হাইপোটেনশন (Postprandial Hypotension):

এটি সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায় এবং খাওয়ার ৩০ মিনিট থেকে ৭৫ মিনিট পর রক্তচাপের আকস্মিক হ্রাস ঘটে। খাবার হজমের জন্য অন্ত্রের দিকে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায়।

ক) লক্ষণ: মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব এবং কখনও কখনও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

খ) কারণ: সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, পার্কিনসন্স রোগ বা ডায়াবেটিস আছে।

. নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন (Neurally Mediated Hypotension – NMH) বা ভাসোভ্যাগাল সিনকোপ (Vasovagal Syncope):

এই ধরনের হাইপোটেনশন শিশুদের এবং অল্পবয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে, ভয় পেলে, প্রচণ্ড ব্যথা হলে, বা মানসিক চাপে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়। এক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের গতি কমে যায় এবং রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়, যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। এটি স্নায়ুতন্ত্রের একটি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ঘটে।

ক) লক্ষণ: বমি বমি ভাব, শীতল ঘাম, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

খ) কারণ: দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, মানসিক চাপ, ব্যথা, ভয়, অতিরিক্ত গরম।

. গুরুতর হাইপোটেনশন (Severe Hypotension) বা শক (Shock):

এটি একটি জীবন-হুমকির কারণ হতে পারে যখন রক্তচাপ অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। এর ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে পর্যাপ্ত রক্ত এবং অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এটি একটি জরুরি অবস্থা।

ক) লক্ষণ: দ্রুত এবং দুর্বল নাড়ি, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, ঠাণ্ডা ও আর্দ্র ত্বক, বিভ্রান্তি, নীলচে ত্বক এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

খ) কারণ:

১) রক্তক্ষরণ (Hemorrhage): গুরুতর আঘাত বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের কারণে প্রচুর রক্তক্ষয়।

২) গুরুতর সংক্রমণ (Sepsis): রক্তপ্রবাহে সংক্রমণের কারণে শরীরের ব্যাপক প্রদাহ।

৩) হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিউর: হৃদপিণ্ড পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে না পারলে।

৪) অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া (Anaphylaxis): গুরুতর অ্যালার্জির ফলে শরীরের প্রতিক্রিয়া।

৫) তীব্র ডিহাইড্রেশন: অতিরিক্ত বমি, ডায়রিয়া বা জ্বরের কারণে গুরুতর পানিশূন্যতা।

অন্যান্য কারণ বা ধরন:

ক) ক্রনিক নিম্ন রক্তচাপ (Chronic Hypotension): কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জন্মগতভাবে বা নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। যদি এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তবে সাধারণত এটি বিপজ্জনক নয়।

খ) এন্ডোক্রাইন সমস্যা: থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম), অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা (অ্যাডিসন রোগ) বা রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) এর কারণেও নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে।

গ) গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় রক্তনালীগুলো প্রসারিত হওয়ায় রক্তচাপ কিছুটা কমে যেতে পারে, যা সাধারণত প্রসবের পর স্বাভাবিক হয়ে যায়।

ঘ) পুষ্টির অভাব: ভিটামিন বি১২ বা ফলিক অ্যাসিডের অভাবজনিত রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) নিম্ন রক্তচাপের কারণ হতে পারে।

ঙ) ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ঔষধ, যেমন – উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ, মূত্রবর্ধক (ডাইউরেটিকস), বিষণ্ণতার ঔষধ বা পার্কিনসন্স রোগের ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রক্তচাপ কমতে পারে।

যদি নিম্ন রক্তচাপের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কারণ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.