থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়:
বিশেষ করে এর গুরুতর রূপ (থ্যালাসেমিয়া মেজর) প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ, এর প্রতিরোধের মূল উপায়গুলো জিনগত স্ক্রিনিং এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং-এর উপর নির্ভরশীল।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের প্রধান উপায়গুলো হলো-
১। বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং (Pre-marital Thalassemia Screening):
এটি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিবাহের আগে সম্ভাব্য দম্পতিদের রক্ত পরীক্ষা (যেমন CBC, Hb Electrophoresis) করানো হয়, যাতে তারা থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা তা জানা যায়।
ক) কেন গুরুত্বপূর্ণ: যদি দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহক (মাইনর) বিবাহ করেন, তবে তাদের সন্তানদের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ২৫% ঝুঁকি থাকে (প্রতিটি গর্ভধারণে)। এই পরীক্ষা আগে থেকে জানা থাকলে দম্পতিরা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
খ) করণীয়: যদি উভয়ই বাহক হন, তাহলে তাদের জেনেটিক কাউন্সেলিং নিতে উৎসাহিত করা হয়, যেখানে তাদের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বিকল্পগুলো সম্পর্কে জানানো হয়।
২।গর্ভধারণের পূর্বে বা প্রারম্ভিক গর্ভাবস্থায় স্ক্রিনিং (Pre-conception or Early Pregnancy Screening):
ক)যারা ইতিমধ্যেই বিবাহিত এবং সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।
খ)যদি কোনো দম্পতির পূর্ববর্তী থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশু থাকে, তবে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় অবশ্যই স্ক্রিনিং করানো উচিত।
গ)যদি গর্ভাবস্থায় দেখা যায় যে ভ্রূণের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ঝুঁকি আছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা দম্পতির ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও আইনগত কাঠামোর উপর নির্ভরশীল।
৩।জেনেটিক কাউন্সেলিং (Genetic Counseling):
থ্যালাসেমিয়া বাহক দম্পতিদের জন্য জেনেটিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন জেনেটিক কাউন্সেলর তাদের রোগের ধরন, ঝুঁকি, উত্তরাধিকারের ধরণ এবং উপলব্ধ বিকল্পগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন।
৪। বিকল্পগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:
ক) প্রসবপূর্ব রোগ নির্ণয় (Prenatal Diagnosis): গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা করা (যেমন কোরিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং – CVS বা অ্যামনিওসেন্টেসিস)। যদি ভ্রূণের থ্যালাসেমিয়া মেজর ধরা পড়ে, তবে দম্পতি গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৫)প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক ডায়াগনোসিস (Pre-implantation Genetic Diagnosis – PGD): ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) পদ্ধতিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর নিষেক ঘটানোর পর ভ্রূণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপনের আগে জিনগত পরীক্ষা করা হয়। শুধুমাত্র সুস্থ ভ্রূণ বা বাহক ভ্রূণ (রোগী নয়) প্রতিস্থাপন করা হয়।
৬)জনসচেতনতা বৃদ্ধি (Public Awareness):
ক)থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই রোগের কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে তথ্য প্রচার করা উচিত।
খ)বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে বিবাহের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করা দরকার।
প্রতিবেদণ:
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম২০১৮সালের০৭ডিসেম্বরএকটিবার্তায়লিখেছেন –
সত্তরেরদশকেপ্রথমবারেরমতোভূমধ্যসাগরীয়অঞ্চলতথাসাইপ্রাস, সার্দিনিয়া (ইতালি) ওগ্রিসেথ্যালাসেমিয়ানির্মুলওনিয়ন্ত্রণেরবিষয়েকর্মসূচিগ্রহণকরাহয়।পরবর্তীতেতাসম্প্রসারিতহয়েছেযুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং, কিউবা, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানিওইরানসহবিভিন্নদেশে।এসবদেশেরবিভিন্নকর্মসূচিরমধ্যেআছেবাহকনির্ণয়, কাউন্সেলিংওঅনাগতসন্তানেরভ্রূণপরীক্ষাকরা।
বেশিরভাগক্ষেত্রেবাহকনির্ণয়ওকাউন্সেলিং- এরজন্যদেশগুলোরস্বেচ্ছাসেবীপ্রতিষ্ঠানগুলোগুরুত্বপূর্ণভূমিকাপালনকরেআসছে।
সাইপ্রাস, লেবানন, ইরান, সৌদিআরব, তিউনিসিয়া, ইউএই, বাহরাইন, কাতারওপ্যালেস্টাইনেরগাজাউপত্যকায়বিয়েরসময়পাত্রপাত্রীরথ্যালাসেমিয়াবিষয়করক্তপরীক্ষাবাধ্যতামূলক।যদিওএসবদেশেবাহকেবাহকেবিয়েনিষিদ্ধনয়এবংএরূপক্ষেত্রেবিয়েরসিদ্ধান্তসংশ্লিষ্টপাত্রপাত্রীরএখতিয়ারাধীন।
চীনেবিবাহপূর্বথ্যালাসেমিয়াপরীক্ষাবাধ্যতামূলককরাহয়েছিল।যদিওতাপরেঐচ্ছিককরাহয়েছে।
মালয়েশিয়াএবংউপমহাদেশেরমালদ্বীপওশ্রীলঙ্কায়বিয়েরআগেথ্যালাসেমিয়াবিষয়েরক্তপরীক্ষাকর্মসূচিগ্রহণকরাহয়েছে।
সম্প্রতিপাকিস্তানেরপার্লামেন্টথ্যালাসেমিয়াপ্রতিরোধেআইনপ্রণয়নকরেছে।এইআইনেথ্যালাসেমিয়াআক্রান্তরোগীররক্তেরসম্পর্কেরআত্মীয়-স্বজনদেররক্তপরীক্ষাবাধ্যতামূলক।
অতিসম্প্রতিভারতেরস্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়সেদেশেরসবগর্ভবতীমহিলারথ্যালাসেমিয়াবিষয়করক্তপরীক্ষাবাধ্যতামূলককরারজন্যএকটিআইনেরপ্রস্তাবকরেছেযাএখনপরীক্ষানিরীক্ষাধীনরয়েছে।
বাংলাদেশে
বাংলাদেশেসম্প্রতিআদালতবিয়েরআগেবর-কনেররক্তপরীক্ষাবাধ্যতামূলককরাবিষয়েসংশ্লিষ্টদেরপ্রতিরুলজারিকরেছেন।এরকয়েকদিনপরইরাজধানীতেথ্যালাসেমিয়াবিষয়কএকটিজাতীয়কর্মশালায়স্বাস্থ্যমন্ত্রীআদালতেরএইপদক্ষেপকেস্বাগতজানিয়েবিয়েরআগেথ্যালাসেমিয়াবিষয়করক্তপরীক্ষারপ্রতিগুরুত্বআরোপকরেছেন।
থ্যালাসেমিয়ামহামারীপ্রতিরোধেবিয়েরআগেরক্তপরীক্ষাকরাওতাপক্ষদ্বয়কেঅবহিতকরারজন্যআইনপ্রণয়নএকটিঅত্যন্তগুরুত্বপূর্ণপদক্ষেপ।পৃথিবীরযেসবদেশেইথ্যালাসেমিয়াপ্রতিরোধহয়েছেসেখানেইআইনএকটিগুরুত্বপূর্ণঅনুষঙ্গহিসেবেকাজকরেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ:
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা, কারণ এখানে প্রচুর থ্যালাসেমিয়া বাহক রয়েছে। সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে কাজ করছে। বিবাহপূর্ব স্ক্রিনিং এবং জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং এর সুযোগ সবার কাছে সহজলভ্য করা উচিত।
সংক্ষেপে, থ্যালাসেমিয়া সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য, বিশেষ করে এর গুরুতর রূপ। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক স্ক্রিনিং কর্মসূচি, সঠিক জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।