...

লিউকেমিয়া (Leukemia) রক্ত কোষের ক্যান্সার।

লিউকেমিয়া (Leukemia)

লিউকেমিয়া (Leukemia) হলো এক ধরণের রক্ত কোষের ক্যান্সার। অন্যান্য ক্যান্সারের মতো এটি কোনো কঠিন টিউমার তৈরি করে না, বরং রক্ত এবং অস্থি মজ্জা (bone marrow)-তে অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটায়। আমাদের শরীরের অস্থি মজ্জাই হলো রক্ত কোষ তৈরির কারখানা, যেখানে লোহিত রক্তকণিকা (red blood cells), শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) এবং অনুচক্রিকা (platelets)—এই তিন ধরনের রক্ত কোষ তৈরি হয়। লিউকেমিয়া মূলত শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) বা শ্বেত রক্তকণিকার পূর্ববর্তী কোষগুলোকে প্রভাবিত করে।

রক্ত কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতা

আমাদের রক্তে তিন ধরনের প্রধান কোষ রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কাজ আছে:

১) লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells/Erythrocytes): অক্সিজেন পরিবহন করে।

২) শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells/Leukocytes): শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

৩) অনুচক্রিকা (Platelets/Thrombocytes): রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং রক্তপাত বন্ধ করে।

সাধারণত, অস্থি মজ্জায় এই কোষগুলো একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে পরিপক্ক হয় এবং রক্তে প্রবেশ করে। কিন্তু লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হলে, অস্থি মজ্জা অস্বাভাবিক বা অপরিণত শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করতে শুরু করে, যাদেরকে লিউকেমিক কোষ (leukemic cells) বলা হয়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয় এবং স্বাভাবিক, সুস্থ রক্ত কোষের উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে, আক্রান্ত ব্যক্তির লোহিত রক্তকণিকা, স্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা এবং অনুচক্রিকার সংখ্যা কমে যায়, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে।

লিউকেমিয়ার প্রকারভেদ

লিউকেমিয়াকে প্রধানত দুইভাবে ভাগ করা হয়:

১. কোষের ধরন অনুযায়ী:

ক) লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (Lymphocytic Leukemia): লিম্ফয়েড স্টেম সেল (lymphoid stem cell) থেকে উদ্ভূত হয়, যা লিম্ফোসাইট (এক ধরণের শ্বেত রক্তকণিকা) তৈরি করে।

খ) মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (Myeloid Leukemia): মায়েলয়েড স্টেম সেল (myeloid stem cell) থেকে উদ্ভূত হয়, যা লোহিত রক্তকণিকা, অনুচক্রিকা এবং অন্যান্য ধরণের শ্বেত রক্তকণিকা (যেমন নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল) তৈরি করে।

২. রোগের গতি অনুযায়ী:

ক)  অ্যাকিউট লিউকেমিয়া (Acute Leukemia): এই ধরণের ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এতে অপরিণত রক্ত কোষ (ব্লাস্ট সেল) দ্রুত উৎপাদিত হয়। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

খ) ক্রনিক লিউকেমিয়া (Chronic Leukemia): এই ধরণের ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে। এতে পরিপক্ক রক্ত কোষগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করে।

এই দুটি ভাগকে একত্রিত করে লিউকেমিয়ার চারটি প্রধান ধরন রয়েছে:

১. অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া (Acute Lymphoblastic Leukemia – ALL):

ক) এটি শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ লিউকেমিয়া।

খ) এতে অপরিণত লিম্ফোসাইট কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

গ)  চিকিৎসা ছাড়া এটি দ্রুত জীবনঘাতী হতে পারে।

২. অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (Acute Myeloid Leukemia – AML):

ক) এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ অ্যাকিউট লিউকেমিয়া।

খ) এতে মায়েলয়েড স্টেম সেলগুলো অপরিণত অবস্থায় থেকে যায় এবং দ্রুত সংখ্যায় বেড়ে যায়। গ) দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

৩. ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (Chronic Lymphocytic Leukemia – CLL):

ক) এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ক্রনিক লিউকেমিয়া।

খ) এতে পরিপক্ক কিন্তু অস্বাভাবিক লিম্ফোসাইট কোষ তৈরি হয়।

গ) অনেক সময় রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না এবং চিকিৎসা ছাড়াই রোগীরা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে, তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

৪. ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (Chronic Myeloid Leukemia – CML):

ক) এটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়।

খ) এতে মায়েলয়েড স্টেম কোষগুলোতে একটি নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন (ফিলাডেলফিয়া ক্রোমোজোম) হয়, যার ফলে অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হয়।

গ) টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে এই রোগকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

লিউকেমিয়ার কারণ ঝুঁকির কারণ

লিউকেমিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ প্রায়শই অজানা থাকে, তবে কিছু কারণ এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে:

১) বিকিরণ (Radiation) রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ: উচ্চ মাত্রার বিকিরণ বা কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন বেঞ্জিন, লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

২) কেমোথেরাপি: পূর্বে অন্যান্য ক্যান্সারের জন্য কেমোথেরাপি গ্রহণ করলে লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৩) ধূমপান: অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

৪) জিনগত সমস্যা: ডাউন সিন্ড্রোম (Down Syndrome) এর মতো কিছু জিনগত সমস্যা লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৫) ভাইরাল সংক্রমণ: কিছু ভাইরাস, যেমন হিউম্যান টি-লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস-১ (HTLV-1), বিরল ধরণের লিউকেমিয়ার সাথে সম্পর্কিত।

৬) পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারের কোনো সদস্যের লিউকেমিয়া থাকে, তবে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।

লিউকেমিয়ার লক্ষণ

লিউকেমিয়ার লক্ষণগুলো রোগের ধরন এবং গতির উপর নির্ভর করে। যেহেতু অস্বাভাবিক রক্ত কোষগুলো স্বাভাবিক রক্ত কোষের উৎপাদনকে বাধা দেয়, তাই লোহিত রক্তকণিকা, স্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকা এবং অনুচক্রিকার অভাবে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়:

১) ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক (লোহিত রক্তকণিকার অভাবে): রক্তস্বল্পতার লক্ষণ।

২) ঘন ঘন সংক্রমণ বা জ্বর (স্বাভাবিক শ্বেত রক্তকণিকার অভাবে): রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

৩) সহজেই রক্তপাত বা কালশিটে পড়া (অনুচক্রিকার অভাবে): নাক বা দাঁত থেকে রক্তপাত হতে পারে।

৪) শ্বাসকষ্ট।

৫) গ্রন্থি ফুলে যাওয়া (লিম্ফ নোড), প্লীহা বা যকৃতের বৃদ্ধি।

৬) অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস।

৭) হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা।

৮) রাতে ঘাম হওয়া।

চিকিৎসা

লিউকেমিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি এর ধরন, রোগীর বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং রোগের পর্যায় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:

১) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটি লিউকেমিয়ার প্রধান চিকিৎসা।

২) রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): উচ্চ-শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা। এটি সাধারণত মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের ক্যান্সার কোষকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়, অথবা অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের আগে।

৩) স্টেম সেল প্রতিস্থাপন (Stem Cell Transplant)/অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow Transplant): এটি উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের পর ক্ষতিগ্রস্ত অস্থি মজ্জাকে সুস্থ স্টেম সেল দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।

৪) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): কিছু লিউকেমিয়াতে ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট দুর্বলতাগুলোকে লক্ষ্য করে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। CML-এর চিকিৎসায় এটি খুব কার্যকর।

৫) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্দীপিত করা হয়।

লিউকেমিয়া একটি গুরুতর রোগ হলেও, চিকিৎসার অগ্রগতির কারণে এখন অনেক রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ALL-এর নিরাময়ের হার অনেক বেশি। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.