টনসিলাইটিস কি (What is tonsillitis)
টনসিলাইটিস কি (What is tonsillitis)?
টনসিলাইটিস (Tonsillitis) হলো টনসিলের সংক্রমণ বা প্রদাহ। আমাদের গলার একদম পেছনে উভয় পাশে দুটি ডিম্বাকৃতির লিম্ফ গ্ল্যান্ড বা লসিকা গ্রন্থি থাকে, যাদেরকে টনসিল বলা হয়। এই টনসিলগুলো শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ এবং মুখ বা নাক দিয়ে প্রবেশকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। যখন এই টনসিলগুলো নিজেরাই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ফুলে ওঠে বা প্রদাহ হয়, তখন সেই অবস্থাকে টনসিলাইটিস বলে।
১. টনসিলাইটিসের কারণ:
টনসিলাইটিস সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয়।
ক) ভাইরাল সংক্রমণ: বেশিরভাগ টনসিলাইটিস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট হয়, যেমন সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস (অ্যাডেনোভাইরাস), ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, বা এপস্টাইন-বার ভাইরাস (যা গ্রন্থিগত জ্বরের কারণ)। ভাইরাল টনসিলাইটিস সাধারণত তুলনামূলকভাবে হালকা হয় এবং অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই নিজে থেকেই সেরে যায়।
খ) ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ: কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে টনসিলাইটিস হয়। সবচেয়ে সাধারণ ব্যাকটেরিয়া হলো স্ট্রেপ্টোকক্কাস পাইয়োজেনেস (Streptococcus pyogenes), যা “স্ট্রেপ থ্রোট” বা গলা ব্যথার কারণ। অন্যান্য ধরনের ব্যাকটেরিয়াও টনসিলের প্রদাহ ঘটাতে পারে। ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিসের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
২. হোমিওপ্যাথি দৃষ্টিকোণে টনসিলাইটিস এবং মায়াজম
হোমিওপ্যাথির প্রতিষ্ঠাতা ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান রোগের মূল কারণ হিসেবে মায়াজমের ধারণাকে তুলে ধরেছেন। মায়াজম হলো শরীরের গভীরে থাকা কিছু দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা বা দূষণ, যা সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রোগের জন্ম দেয়। হ্যানিম্যানের মতে, সব রোগই কোনো না কোনো মায়াজমের প্রকাশ। টনসিলাইটিসের ক্ষেত্রেও হোমিওপ্যাথিতে মায়াজমের প্রভাব বিবেচনা করা হয়।
৩. ডা. হ্যানিম্যান তিনটি প্রধান মায়াজমের কথা বলেছেন
ক) সোরিক মায়াজম (Psora): এটি মৌলিক মায়াজম হিসেবে পরিচিত এবং এটি শরীরের দুর্বলতা, কার্যকারিতা হ্রাস এবং চুলকানিযুক্ত চর্মরোগের মতো অবস্থার সাথে জড়িত। টনসিলাইটিসের ক্ষেত্রে, বারবার ঠান্ডা লাগা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা, বা ইনফেকশনের প্রতি সংবেদনশীলতার পেছনে সোরিক মায়াজমের প্রভাব থাকতে পারে।
খ) সাইকোটিক মায়াজম (Sycosis): এই মায়াজম অতিরিক্ত বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত নিঃসরণের সাথে সম্পর্কিত, যেমন আঁচিল বা টিউমার। টনসিলের ক্ষেত্রে, যদি টনসিল গ্রন্থিগুলি ফুলে যায় বা আকারে বড় হয়ে যায় (হাইপারট্রফি), এবং তাতে বারবার প্রদাহ হয়, তাহলে এর পেছনে সাইকোটিক মায়াজমের প্রভাব থাকতে পারে।
গ) সিফিলিটিক মায়াজম (Syphilis): এই মায়াজম ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া বা আলসারেশনের সাথে জড়িত। যদি টনসিলাইটিস তীব্র হয় এবং টিস্যু ধ্বংস বা আলসার দেখা দেয়, অথবা যদি এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জটিল আকার ধারণ করে, তাহলে সিফিলিটিক মায়াজমের প্রভাব থাকতে পারে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা যখন টনসিলাইটিসের চিকিৎসা করেন, তখন তারা শুধুমাত্র বর্তমান লক্ষণগুলির ওপর মনোযোগ দেন না, বরং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, বংশগত প্রবণতা এবং কোন মায়াজমটি তার মধ্যে সক্রিয় রয়েছে, তা বিবেচনা করেন। এই মায়াজমভিত্তিক বিশ্লেষণ রোগীকে দীর্ঘমেয়াদী আরোগ্যের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে এবং রোগের পুনরাবৃত্তি কমাতেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সঠিক মায়াজমেটিক ওষুধ নির্বাচন করার মাধ্যমে রোগীর গভীর স্তরের রোগ প্রবণতাকে ঠিক করার চেষ্টা করা হয়।
৪. টনসিলাইটিসের লক্ষণ:
টনসিলাইটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-
ক) তীব্র গলা ব্যথা, যা গিলতে গেলে আরও বাড়ে।
খ) ফোলা, লালচে টনসিল (কখনও কখনও সাদা বা হলুদ আবরণ বা পুঁজের ছোপ থাকতে পারে)।
গ) গিলতে অসুবিধা।
ঘ) জ্বর।
ঙ) কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বা ভারী হয়ে যাওয়া।
চ) গলার লিম্ফ নোড (ঘাড়ের গ্রন্থি) ফুলে যাওয়া এবং ব্যথা হওয়া।
ছ) মাথাব্যথা।
জ) পেটে ব্যথা (বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে)।
ঝ) বমি বমি ভাব বা বমি।
ঞ) মুখে দুর্গন্ধ।
ট) কানে ব্যথা (গলার ব্যথার কারণে)।
ঠ) কাশি।
৫. টনসিলাইটিসের প্রকারভেদ:
ক) তীব্র টনসিলাইটিস (Acute Tonsillitis): এটি হঠাৎ শুরু হয় এবং সাধারণত কয়েক দিন বা এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়।
খ) দীর্ঘস্থায়ী টনসিলাইটিস (Chronic Tonsillitis): যদি টনসিলাইটিস বারবার হয় বা লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তাহলে তাকে দীর্ঘস্থায়ী টনসিলাইটিস বলে।
গ) পুনরাবৃত্ত টনসিলাইটিস (Recurrent Tonsillitis): যখন একজন ব্যক্তি এক বছরে বেশ কয়েকবার টনসিলাইটিসে আক্রান্ত হন (যেমন এক বছরে ৫-৭ বার), তখন তাকে পুনরাবৃত্ত টনসিলাইটিস বলে।
৫. চিকিৎসা:
টনসিলাইটিসের কারণের উপর নির্ভর করে এর চিকিৎসা ভিন্ন হয়:
ক) ভাইরাল টনসিলাইটিস: সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, প্রচুর তরল পান করা, লবণ পানি দিয়ে গার্গল করা এবং ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন প্যারাসিটামল) দিয়ে লক্ষণগুলি উপশম করা হয়।
খ) ব্যাকটেরিয়াল টনসিলাইটিস: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করা জরুরি, এমনকি যদি লক্ষণগুলো কমেও যায়, যাতে সংক্রমণ সম্পূর্ণরূপে দূর হয় এবং জটিলতা এড়ানো যায়।
গ) অস্ত্রোপচার (টনসিলেক্টোমি): যদি টনসিলাইটিস ঘন ঘন হয়, অন্যান্য চিকিৎসায় সাড়া না দেয়, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়, বা অন্য কোনো জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে টনসিল অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার (টনসিলেক্টোমি) করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।