...

থাইরয়েড ক্যান্সার (Thyroid Cancer)

থাইরয়েড ক্যান্সার (Thyroid Cancer):

থাইরয়েড ক্যান্সার (Thyroid Cancer) হলো এক ধরনের ক্যান্সার যা গলার থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ থেকে শুরু হয়। থাইরয়েড গ্রন্থি হলো প্রজাপতি-আকৃতির একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি যা ঘাড়ের সামনের দিকে, অ্যাডাম’স অ্যাপলের (Adam’s apple) ঠিক নিচে অবস্থিত। এই গ্রন্থি শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন তৈরি করে।

যখন থাইরয়েড গ্রন্থির কোষগুলোতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে (মিউটেশন) এবং তারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন এই ক্যান্সার তৈরি হয়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো একটি পিণ্ড বা টিউমার তৈরি করতে পারে এবং কখনও কখনও শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে (মেটাস্ট্যাসিস)।

থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রকারভেদ:

থাইরয়েড ক্যান্সারকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়, যা তাদের উৎপত্তি এবং আক্রমণাত্মকতার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়:

১)প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যান্সার (Papillary Thyroid Cancer – PTC):

ক) এটি থাইরয়েড ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ প্রকার (প্রায় ৮০-৮৫%)।

খ) এটি থাইরয়েড ফলিকুলার কোষ থেকে বিকশিত হয়।

গ) সাধারণত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তবে এর পূর্বাভাস (প্রগনোসিস) খুব ভালো।

২) ফলিকুলার থাইরয়েড ক্যান্সার (Follicular Thyroid Cancer – FTC):

ক) এটি দ্বিতীয় সবচেয়ে সাধারণ প্রকার (প্রায় ১০-১৫%)।

খ) এটিও ফলিকুলার কোষ থেকে উদ্ভূত হয়।

গ) প্যাপিলারির চেয়ে কিছুটা বেশি আক্রমণাত্মক হতে পারে এবং সাধারণত রক্তনালীর মাধ্যমে ফুসফুস বা হাড়ের মতো দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এর পূর্বাভাসও সাধারণত ভালো।

৩) মেডুলারি থাইরয়েড ক্যান্সার (Medullary Thyroid Cancer – MTC):

ক) এটি বিরল প্রকৃতির (প্রায় ১-২%)।

খ) এটি থাইরয়েড গ্রন্থির সি কোষ (C cells) থেকে উদ্ভূত হয়, যা ক্যালসিটোনিন হরমোন তৈরি করে।

গ) প্রায় ২৫% মেডুলারি থাইরয়েড ক্যান্সার বংশগত এবং এটি মাল্টিপল এন্ডোক্রাইন নিওপ্লাসিয়া টাইপ ২ (MEN2) নামক একটি জেনেটিক সিনড্রোমের অংশ হতে পারে। এটি লিম্ফ নোড এবং অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 ৪) অ্যানাপ্লাস্টিক থাইরয়েড ক্যান্সার (Anaplastic Thyroid Cancer – ATC):

ক) এটি থাইরয়েড ক্যান্সারের সবচেয়ে বিরল (১% এর কম) এবং সবচেয়ে আক্রমণাত্মক প্রকার।

খ) এটি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

গ) এটি সাধারণত বয়স্কদের (৬০ বছরের বেশি) মধ্যে দেখা যায় এবং এর পূর্বাভাস খুব খারাপ।

 থাইরয়েড ক্যান্সারের কারণ ঝুঁকি:

থাইরয়েড ক্যান্সারের সঠিক কারণ প্রায়শই অজানা, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে-

১) বিকিরণ এক্সপোজার (Radiation Exposure): শৈশবে মাথা বা ঘাড়ে উচ্চ মাত্রার বিকিরণ (যেমন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য) থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

২) পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে থাইরয়েড ক্যান্সার বা কিছু নির্দিষ্ট জেনেটিক সিনড্রোমের (যেমন MEN2 সিনড্রোম, ফ্যামিলিয়াল অ্যাডেনোম্যাটাস পলিপোসিস) ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

৩) লিঙ্গ: পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সার প্রায় তিনগুণ বেশি দেখা যায়।

৪) বয়স: যদিও এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪০-৬০ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬০-৮০ বছর বয়সে ঝুঁকি বেশি থাকে।

৫) আয়োডিনের মাত্রা: কিছু গবেষণায় আয়োডিনের খুব কম বা খুব বেশি মাত্রাও থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত বলে দেখা গেছে।

৬) স্থূলতা (Obesity): অতিরিক্ত ওজন থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

লক্ষণ:

থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়শই কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে, যখন এটি বৃদ্ধি পায়, তখন নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে-

ক) ঘাড়ে একটি পিণ্ড বা ফোলা (Thyroid Nodule): এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। পিণ্ডটি সাধারণত শক্ত, ব্যথাহীন হয় এবং ধীরে ধীরে বড় হয়।

খ) স্বর পরিবর্তন বা ফ্যাসফেসে কণ্ঠস্বর: টিউমার স্বরনালীর উপর চাপ সৃষ্টি করলে এমন হতে পারে।

গ) গিলতে অসুবিধা (Dysphagia): খাদ্যনালীর উপর চাপ পড়ার কারণে খাবার গিলতে সমস্যা হতে পারে।

ঘ) শ্বাস নিতে অসুবিধা (Dyspnea): শ্বাসনালীর উপর চাপ পড়ার কারণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

ঙ) ঘাড় বা গলায় ব্যথা: ব্যথা কান পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

চ) দীর্ঘস্থায়ী কাশি: যা ঠাণ্ডা বা অ্যালার্জির কারণে নয়।

ছ) ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া।

রোগ নির্ণয়:

১) শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক ঘাড় পরীক্ষা করে কোনো পিণ্ড বা ফোলা আছে কিনা তা দেখেন।

২) রক্ত পরীক্ষা: থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা (TSH, T3, T4) এবং কিছু ক্ষেত্রে থাইরোগ্লোবুলিন (Thyroglobulin) বা ক্যালসিটোনিন (Medullary Thyroid Cancer-এর জন্য) পরীক্ষা করা হয়।

৩) আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasound): থাইরয়েড গ্রন্থির বিস্তারিত চিত্র দেখতে এবং নোডুলের আকার, সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়।

৪) এফএনএ বায়োপসি (Fine Needle Aspiration – FNA Biopsy): আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে একটি পাতলা সুঁচ দিয়ে নোডুল থেকে কোষের নমুনা সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। এটি থাইরয়েড ক্যান্সার নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

৫) অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট: সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পিইটি স্ক্যান (PET Scan) ক্যান্সারের বিস্তৃতি নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসা:

থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসা ক্যান্সারের প্রকার, আকার, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। থাইরয়েড ক্যান্সার অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় সাধারণত অনেক বেশি নিরাময়যোগ্য, বিশেষ করে প্যাপিলারি এবং ফলিকুলার ধরনের ক্ষেত্রে।

অস্ত্রোপচার (Surgery):

এটি থাইরয়েড ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান চিকিৎসা।

১) থাইরয়েডেক্টমি (Thyroidectomy): থাইরয়েড গ্রন্থির সম্পূর্ণ বা আংশিক অপসারণ। ক্যান্সারের ধরন এবং বিস্তৃতির উপর নির্ভর করে লিম্ফ নোডও অপসারণ করা হতে পারে। * অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে সাধারণত আজীবন থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন (লেভোথাইরক্সিন) ঔষধ নিতে হয়।

২) রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন থেরাপি (Radioactive Iodine Therapy – RAI):  অস্ত্রোপচারের পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাইরয়েড টিস্যু বা ক্যান্সার কোষ থেকে যায় (বিশেষ করে যেগুলি আয়োডিন শোষণ করে), তবে এটি ধ্বংস করার জন্য তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করা হয়। এটি মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের চিকিৎসায়ও কার্যকর।

৩) থাইরয়েড হরমোন সাপ্রেশন থেরাপি (Thyroid Hormone Suppression Therapy): অস্ত্রোপচার এবং/অথবা রেডিওআয়োডিন থেরাপির পর রোগীকে উচ্চ মাত্রায় লেভোথাইরক্সিন দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো TSH (থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন) এর মাত্রা কমিয়ে রাখা, কারণ TSH অবশিষ্ট থাইরয়েড কোষ বা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করতে পারে।

৪) এক্সটার্নাল বিম রেডিয়েশন থেরাপি (External Beam Radiation Therapy – EBRT): * বিরল এবং আরও উন্নত অ্যানাপ্লাস্টিক বা মেডুলারি থাইরয়েড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে যেখানে ক্যান্সার অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে বা অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়, তখন এই চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।

৫) কেমোথেরাপি (Chemotherapy): * অ্যানাপ্লাস্টিক থাইরয়েড ক্যান্সারের মতো আগ্রাসী ধরনের ক্যান্সারের জন্য বা যখন অন্যান্য চিকিৎসা ব্যর্থ হয়, তখন কেমোথেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি সাধারণত থাইরয়েড ক্যান্সারের জন্য খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না।

৬) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): * এই নতুন ধরনের ঔষধগুলো ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট প্রোটিন বা পথগুলোকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যা ক্যান্সারের বৃদ্ধি ও বিস্তারে জড়িত। এটি উন্নত বা পুনরাবৃত্ত ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

থাইরয়েড ক্যান্সার সাধারণত একটি নিরাময়যোগ্য ক্যান্সার। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা হলে বেশিরভাগ রোগীর ভালো পূর্বাভাস থাকে। তাই, গলায় কোনো অস্বাভাবিক ফোলা বা লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.