...

হিমোফিলিয়া রোগের ইতিহাস

হিমোফিলিয়া রোগের ইতিহাস

হিমোফিলিয়া একটি রক্তপাতজনিত রোগ যা বংশগতভাবে সংক্রমিত হয়। এই রোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো, যদিও এর সঠিক নামকরণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনেক পরে হয়েছে। নিচে এর ইতিহাসের প্রধান পর্যায়গুলো উল্লেখ করা হলো:

প্রাচীন উল্লেখ (২য় শতাব্দী .ডি.):

হিমোফিলিয়ার প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় হিব্রু শাস্ত্রে (তালমুদ)। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো শিশুর প্রথম দুই ভাইয়ের খতনা করার পর অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে মৃত্যু হয়, তবে তৃতীয় ভাইয়ের খতনা না করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি সম্ভবত হিমোফিলিয়ার একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ছিল।

প্রাথমিক আধুনিক বর্ণনা (১৮০৩ সাল):

১৮০৩ সালে ফিলাডেলফিয়ার চিকিৎসক ড. জন কনরাড অটো একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতে তিনি একটি বংশগত রক্তপাতজনিত রোগের বর্ণনা দেন যা মূলত পুরুষদের মধ্যে দেখা যায় এবং সুস্থ নারীদের মাধ্যমে বাহিত হয়। তিনি এই রোগে আক্রান্ত পুরুষদের “ব্লিডারস” (bleeders) বলে উল্লেখ করেন। তিনিই প্রথম এই রোগের বংশগত প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন।

হিমোফিলিয়ানামকরণ (১৮২৮ সাল):

১৮২৮ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোহান লুকাস শোনলেইন এবং তার ছাত্র ফ্রেডরিখ হপফ এই রোগের জন্য “হেমোর্যাফিলিয়া” (Haemorraphilia) নামটি প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে এটি সংক্ষিপ্ত হয়ে “হিমোফিলিয়া” (Haemophilia) হয়।

রাজকীয় রোগ” (১৯শ শতাব্দী):

১৯শ শতাব্দীতে হিমোফিলিয়া “রাজকীয় রোগ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর কারণ ছিল ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন রাজপরিবারে এই রোগের বিস্তার। রানী ভিক্টোরিয়া নিজে হিমোফিলিয়া বি-এর বাহক ছিলেন এবং তার পুত্র লিওপোল্ডসহ তার বংশধরদের মধ্যে (রাশিয়া, স্পেন ও জার্মানির রাজপরিবারে) এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল।

চিকিৎসার অগ্রগতি (২০শ শতাব্দী):

১৯৪০-এর দশকে: প্রথম সফল চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে পুরো রক্ত ​​সঞ্চালনের মাধ্যমে হিমোফিলিয়া রোগীদের রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

১৯৩৭ সালে:

প্যাটেক ও টেলর নামক গবেষকরা প্লাজমা থেকে একটি পদার্থ আবিষ্কার করেন যা রক্ত ​​জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। তারা এর নাম দেন “অ্যান্টি-হিমোফিলিক গ্লোবুলিন” (Anti-haemophilic globulin), যা পরবর্তীতে ফ্যাক্টর VIII নামে পরিচিত হয়।

১৯৫০এর দশকে:

ফ্যাক্টর VIII এবং ফ্যাক্টর IX এর মতো জমাট বাঁধা ফ্যাক্টরগুলোর অভাব হিমোফিলিয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

১৯৬০এর দশকে:

ড. জুডিথ গ্রাহাম পুল ক্রায়োপ্রেসিপিটেট (cryoprecipitate) আবিষ্কার করেন, যা হিমোফিলিয়া চিকিৎসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। এটি ফ্যাক্টর VIII সমৃদ্ধ একটি প্লাজমা ডেরিভেটিভ যা রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ছিল।

১৯৭০ ১৯৮০এর দশকে:

প্লাজমা-প্রাপ্ত ফ্যাক্টর কনসেন্ট্রেট ব্যবহার করে হিমোফিলিয়া রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। তবে, এই সময়ে রক্তবাহিত ভাইরাস (যেমন এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সি) দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, কারণ সেই সময়ে ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি ততটা উন্নত ছিল না।

১৯৮০এর দশকের শেষের দিকে ১৯৯০এর দশকে:

রিকম্বিন্যান্ট ফ্যাক্টর কনসেন্ট্রেট (recombinant factor concentrates) আবিষ্কার হয়, যা মানব প্লাজমা থেকে প্রাপ্ত নয়, ফলে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায় এবং হিমোফিলিয়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিপ্লব আনে।

বর্তমান সময়:

বর্তমানে হিমোফিলিয়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরও অনেক অগ্রগতি হয়েছে, যেমন উন্নত ফ্যাক্টর কনসেন্ট্রেট, বর্ধিত অর্ধ-জীবন সহ নতুন থেরাপি এবং জিন থেরাপি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা এই রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। হিমোফিলিয়ার ইতিহাস মানুষের জ্ঞান এবং চিকিৎসার উন্নতির একটি দীর্ঘ যাত্রা প্রতিফলিত করে।

 

Scroll to Top
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.