হিমোফিলিয়া (Hemophilia) কী
হিমোফিলিয়া (Hemophilia) কী?
হিমোফিলিয়া শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ হাইমা এবং ফিলিয়া হতে। “হিমোফিলিয়া” দুটি গ্রীক শব্দ: hema (meaning “blood” or “streams of blood”) and philia (meaning “love” or “tendency to”) হেমা (যার অর্থ “রক্ত” বা “রক্তের স্রোত”) এবং ফিলিয়া (যার অর্থ “ভালোবাসা” বা “প্রবৃত্তি”)। এই শব্দগুলির সংমিশ্রণ “রক্তের প্রতি ভালোবাসা” বা এর প্রতি আকৃষ্টতার ইঙ্গিত দেয়, যা অতিরিক্ত রক্তপাত দ্বারা চিহ্নিত একটি ব্যাধির বিপরীত স্বজ্ঞাত বর্ণনা। হাইমা অর্থ রক্ত এবং ফিলিয়া অর্থ আকর্ষণ। দেহের কোনো অংশে রক্তপাত শুরু হলে সাধারণত সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে থাকে। মেডিকেলের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে ক্লটিং বলে। ক্লটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্ত জমাট বেঁধে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। দেহের কোথাও কোনো ক্ষত তৈরি হলে সেই ক্ষতস্থান সময়ের সাথে সাথে শুকিয়ে যাওয়াকেই ক্লটিং বলে। যে পদার্থ রক্তক্ষরণে বাঁধা দেয় তাকে ক্লট বলে। কিন্তু কোনো কারণে ক্ষতস্থানে এই ক্লট তৈরি না হলে সেখান থেকে একাধারে রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
১. হিমোফিলিয়া হলো একটি বংশগত রক্তের রোগ:
একটি জন্মগত, বংশগত রক্তরোগ, যা মা-বাবার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে জীনের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়। জীন হচ্ছে এক ধরনের প্রোটিন। মানুষের গায়ের রং, চুল, সর্বোপরি পূর্ণতা প্রাপ্তিতে যা কিছু দরকার, সবই এই জীনের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে। যেখানে রক্ত সঠিকভাবে জমাট বাঁধতে পারে না। এর কারণ হলো রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রোটিন (যাকে ক্লটিং ফ্যাক্টর বা জমাট বাঁধার উপাদান বলা হয়) এর অভাব বা ত্রুটি। ফলে, হিমোফিলিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সামান্য আঘাতেও অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে, এমনকি কোনো আঘাত ছাড়াই অভ্যন্তরীণ রক্তপাতও হতে পারে। মনে রাখা উচিত, ৩০ শতাংশ হিমোফিলিয়া রোগীর ক্ষেত্রে মা-বাবার কাছ থেকে রোগ সঞ্চালিত না হয়েও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে রোগীর নিজের মধ্যে জীনের পরিবর্তনের ফলেই এ রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। একজন হিমোফিলিয়া আক্রান্ত রোগীর দেহে এই ক্লট সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক নয়। ব্যাপারটি এমন নয় যে, রোগীর দেহ থেকে অঝোরে এবং খুব দ্রুত রক্তক্ষরণ হতে থাকবে। একজন হিমোফিলিয়াক (যারা হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত) ব্যক্তির দেহ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অনেকে হয়তো এখন মনে করছেন যে, এই রোগ হলে হাত, পা, হাঁটু ইত্যাদির কোথাও কেটে গেলেই তা থেকে অনবরত রক্ত ঝরতে থাকবে; ব্যাপারটি ঠিক তা নয়। দেহের বাইরের কোনো ছোটখাটো আঘাত এখানে খুব একটা চিন্তার বিষয় নয়। চিন্তার বিষয় হলো ইন্টারনাল ব্লিডিং বা দেহের অভ্যন্তরীণ কোনো অংশে রক্তক্ষরণ। এই ধরণের রক্তক্ষরণকে হ্যামোরেজ বলে। এটি সাধারণত দেখা যায় দেহের ভিতরে কোনো সন্ধি যেমন- হাঁটু ও গোড়ালিতে। এছাড়া দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন টিস্যু ও পেশীর মিলন-স্থলেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। দেহের ভিতরে এমন রক্তক্ষরণ অনেক যন্ত্রণাদায়ক হয় এবং আক্রান্ত অংশ বেশ ফুলতে শুরু করে।
২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো:
ক) রক্ত জমাট বাঁধা প্রক্রিয়া: যখন কোনো ক্ষত হয়, তখন রক্তপাত বন্ধ করার জন্য শরীর একটি জটিল প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় রক্তকণিকা (প্লেটলেট) এবং ক্লটিং ফ্যাক্টর নামক প্রোটিনগুলো একসাথে কাজ করে একটি জমাট বাধে, যা রক্তপাত বন্ধ করে। হিমোফিলিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে, এই ক্লটিং ফ্যাক্টরগুলোর অভাব বা ত্রুটির কারণে জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়।
খ) বংশগত রোগ: হিমোফিলিয়া সাধারণত একটি বংশগত (inherited) রোগ, যা বাবা-মা থেকে সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এটি মূলত এক্স-লিঙ্কড (X-linked) প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত রোগ। এর মানে হলো, রোগ সৃষ্টিকারী জিনটি এক্স ক্রোমোজোমে অবস্থিত।
৩. কারা আক্রান্ত হয়?
ক) পুরুষরাই বেশি আক্রান্ত হয়: যেহেতু পুরুষদের একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকে (XY), যদি তাদের X ক্রোমোজোমে ত্রুটিপূর্ণ হিমোফিলিয়া জিন থাকে, তাহলে তারা রোগে আক্রান্ত হন।
খ) নারীরা বাহক হয়: নারীদের দুটি X ক্রোমোজোম থাকে (XX)। যদি তাদের একটি X ক্রোমোজোমে ত্রুটিপূর্ণ হিমোফিলিয়া জিন থাকে এবং অন্য X ক্রোমোজোমটি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে তারা সাধারণত রোগের লক্ষণ প্রকাশ করেন না, তবে তারা এই জিনের বাহক (carrier) হন এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে রোগটি সঞ্চারিত করতে পারেন। খুব বিরল ক্ষেত্রে নারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন, যদি তাদের উভয় X ক্রোমোজোমে ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে অথবা অন্য কোনো জটিল জিনগত কারণে।
৪. হিমোফিলিয়ার প্রকারভেদ:
হিমোফিলিয়ার মূলত দুটি প্রধান প্রকার রয়েছে, যা কোন ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাবের কারণে হয় তার উপর নির্ভর করে:
১. হিমোফিলিয়া A (Hemophilia A): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এই ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর VIII (8) নামক ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাব থাকে।
২. হিমোফিলিয়া B (Hemophilia B): এটি দ্বিতীয় সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এই ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর IX (9) নামক ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাব থাকে। এটিকে “ক্রিসমাস ডিজিজ”ও বলা হয়।
এছাড়াও, খুব বিরল ক্ষেত্রে হিমোফিলিয়া C (ফ্যাক্টর XI এর অভাব) এবং অ্যাকোয়ার্ড হিমোফিলিয়া (Acquired Hemophilia) নামে এক ধরনের হিমোফিলিয়া হতে পারে, যা বংশগত নয় বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত ক্লটিং ফ্যাক্টরগুলোকে আক্রমণ করলে ঘটে।
৫. লক্ষণসমূহ:
হিমোফিলিয়ার লক্ষণ রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। হালকা ক্ষেত্রে শুধু গুরুতর আঘাত বা অস্ত্রোপচারের পর রক্তপাত হতে পারে, কিন্তু গুরুতর ক্ষেত্রে সামান্য আঘাত বা এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই রক্তপাত হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
ক) দীর্ঘস্থায়ী ও অতিরিক্ত রক্তপাত (ছোট্ট কাট বা আঘাতের পরও)
খ) সহজে কালশিটে পড়া (bruising)
গ) গাঁটে রক্তপাত (বিশেষ করে হাঁটু, কনুই, গোড়ালিতে), যা ব্যথা, ফোলা এবং জয়েন্ট শক্ত করে দেয়।
ঘ) পেশী বা নরম টিস্যুতে রক্তপাত (হেমাটোমা)।
ঙ) নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত।
চ) দাঁত তোলার পর অতিরিক্ত রক্তপাত।
ছ) মূত্র বা মলের সাথে রক্ত।
জ) শিশুদের ক্ষেত্রে টিকা বা ইনজেকশনের পর রক্তপাত।
ঝ) অভ্যন্তরীণ রক্তপাত (যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং জীবন-হুমকি সৃষ্টি করতে পারে)।
চিকিৎসা:
হিমোফিলিয়ার কোনো নিরাময় নেই, তবে যে চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে তা রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। প্রধান চিকিৎসা হলো অনুপস্থিত ক্লটিং ফ্যাক্টরটি শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা। এটি নিয়মিতভাবে (প্রোফাইলাক্সিস) অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী (অন-ডিমান্ড) দেওয়া যেতে পারে।
হিমোফিলিয়া একটি গুরুতর অবস্থা হতে পারে, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।