হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে
হোমিওপ্যাথি (Homeopathy) এর ইতিহাস
হোমিওপ্যাথি একটি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি, যার উৎপত্তি জার্মানিতে, প্রায় দু'শ বছর আগে।
এর জনক হলেন জার্মান চিকিৎসক ডা. ক্রিস্টিয়ান ফ্রিডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান
(Christian Friedrich Samuel Hahnemann)।
হোমিওপ্যাথির জন্ম ও বিকাশ:
শুরুর প্রেক্ষাপট- আঠারো শতকের শেষের দিকে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি (যা পরবর্তীতে অ্যালোপ্যাথি
নামে পরিচিতি লাভ করে) প্রায়শই অকার্যকর এবং ক্ষতিকারক ছিল। এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত উচ্চ মাত্রার
ওষুধ প্রায়শই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। হ্যানিম্যান নিজেও প্রচলিত অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির
সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এর থেকে সরে আসেন।
সদৃশ বিধান (Similia Similibus Curentur):
হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন, "সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে" (Like Cures Like)। অর্থাৎ, যে উপাদান সুস্থ
মানুষের দেহে অধিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ সৃষ্টি করে, সেই একই উপাদান যখন খুব
অল্প মাত্রায় অসুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা সেই লক্ষণযুক্ত রোগকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য
করে। এই মূলনীতিই হোমিওপ্যাথির ভিত্তি অথার্ৎ (Similia Similibus Curentur)।
গবেষণা ও আবিষ্কার:
১৭৯০ সালে শ্রদ্ধেয় স্যার হ্যানিম্যান নিজেই বিভিন্ন ওষুধের গুণাবলী সুস্থ মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা শুরু করেন।
তিনি কুইনাইন নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন যে এটি সুস্থ মানুষের মধ্যে ম্যালেরিয়ার মতো লক্ষণ সৃষ্টি
করে। এই পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে তিনি অনুমান করেন যে যেই ওষুধ সুস্থ মানুষের মধ্যে রোগের লক্ষণ
তৈরি করে, সেটিই আবার সেই রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে। এভাবেই যথাক্রমে ১৭৯৬ সালে তিনি
"হোমিওপ্যাথি" নামে একটি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির রূপরেখা প্রকাশ করেন।
"অর্গানন অব মেডিসিন":
১৮১০ সালে হ্যানিম্যান তাঁর চিকিৎসা নিয়মাবলী সংক্রান্ত গ্রন্থ "অর্গানন অব রেসনাল হেলিং আর্ট" (Organon der
rationellen Heilkunde) জার্মান ভাষায় প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীকালে "অর্গানন অব মেডিসিন (Organon of
Medicine )" নামে পরিচিতি লাভ করে। এই গ্রন্থে তিনি হোমিওপ্যাথির মূলনীতি (Principles of Homeopathy),
ওষুধ তৈরির পদ্ধতি এবং চিকিৎসার নিয়মকানুন বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
ঔষধের শক্তিকরণ (Dynamization/Potentization):
শ্রদ্ধেয় স্যার হ্যানিম্যান শুধু "সদৃশ বিধান (Similar provisions )"-এর উপর নির্ভর করেননি, তিনি বিশ্বাস করতেন
যে ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য এটিকে বারবার লঘু (dilute) এবং ঝাঁকাতে (succuss) হবে। এই প্রক্রিয়াকে
"শক্তিকরণ" বা "ডায়নামাইজেশন" বলা হয়। এর ফলে ওষুধের ভৌত পদার্থগত পরিমাণ কমে গেলেও এর নিরাময়
ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় বলে তিনি মনে করতেন।
হোমিওপ্যাথির বিস্তার:
ইউরোপে বিস্তার: শ্রদ্ধেয় স্যার ডাঃ হ্যানিম্যানের উদ্ভাবনের পর ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে
হোমিওপ্যাথি জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ: ভারতীয় উপমহাদেশে হোমিওপ্যাথির ব্যবহার শুরু হয় প্রায় আশি
বছর আগে, অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। এখানে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে, বিশেষ করে সহজলভ্যতা, কম খরচ
এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হওয়ার কারণে।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি: বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রচলিত আছে। এখানে
বেসরকারি ও সরকারি উদ্যোগে হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ব্যাচেলর অব
হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (BHMS) ও ডিপ্লোমা হোমিওপ্যাথি মেডিসিন এন্ড সার্জারি (DHMS) ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি মেডিসিন এর প্রচলন বা শুরু: বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির প্রচলন বা শুরু
ঠিক কখন হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্ট ভাবে উপস্থাপন করা কঠিন। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে (অর্থাৎ প্রায় আশি বছর আগে) জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও বহুকাল ধরে
এই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত আছে।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। এটি বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত একটি সায়ত্বশাসিত মেডিকেল
কলেজ। এটি ১৯৪৮ সালে ৫ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় যা বর্তমানে বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিতে শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড গঠন (১৯৭২ সাল): বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ
সরকার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মানোন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে "বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড" গঠন করে। এই বোর্ড ডিপ্লোমা
অব হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (DHMS) কোর্স অনুমোদন, নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব
পালন করে।
Bachelor of Homeopathic Medicine and Surgery (BHMS) ডিগ্রি চালু: ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাঁচ বছর মেয়াদী গ্র্যাজুয়েশন (সম্মান) কোর্স চালু করা হয়।
সরকারি হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রি কলেজ (১৯৮৯ সাল): সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে "সরকারি
হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রি কলেজ" প্রতিষ্ঠিত হয়, যা Bachelor of Homeopathic Medicine and Surgery (BHMS) ডিগ্রি প্রদান করে।
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন, ২০২৩: সম্প্রতি "বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
শিক্ষা আইন, ২০২৩" বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডকে প্রতিস্থাপন
করে "বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল" প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা হোমিওপ্যাথির শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে
আরও সুসংগঠিত করতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা মূলত এর সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম খরচ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনতার ধারণার কারণে
ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বেশি হলেও, বর্তমানে
উচ্চবিত্তরাও এই চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশে বহু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক তাদের দক্ষতা ও গবেষণালব্ধ চিকিৎসার
মাধ্যমে হোমিওপ্যাথির সাফল্যকে ব্যাপক হারে উপস্থাপন করেছেন, সাথে সাথে হোমিওপ্যাথিতে এক অনন্য সাফল্য অর্জন
করেছেন
হোমিওপ্যাথি নিয়ে বিতর্ক: হোমিওপ্যাথি নিয়ে চিকিৎসা ও বিজ্ঞানী মহলে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে।
অনেক আধুনিক বিজ্ঞানী একে ছদ্মবিজ্ঞান বা প্লেসিবো ইফেক্ট (Placebo Effect) বলে আখ্যায়িত করেন, কারণ এর কার্যকারিতা
নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পর্যাপ্ত নয়। তবে, অসংখ্য রোগী এবং চিকিৎসক বিশ্বাস করেন যে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা ও জটিল রোগের
ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি কার্যকর ভূমিকা রাখে। শ্রদ্ধেয় স্যার হ্যানিম্যানের জন্মদিন ১০ এপ্রিল, সারা বিশ্বে "বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবস"
হিসেবে পালিত হয়, যা এই চিকিৎসা পদ্ধতির অবদানকে স্মরণ করার এবং এর সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি সুযোগ।