মৃগীরোগের আধুনিক চিকিৎসা রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে বহু-মাত্রিক এবং
ব্যক্তিগতকৃত হয়। লক্ষ্য থাকে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানো এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
৭০% পর্যন্ত মৃগীরোগী সঠিক ঔষধের মাধ্যমে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে, যাদের ঔষধ কাজ করে না, তাদের
জন্য অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে।
মৃগীরোগের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
এটি মৃগীরোগের চিকিৎসার সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান উপায়। বর্তমানে
৪০টিরও বেশি AEDs ঔষধ বাজারে উপলব্ধ। এই ঔষধগুলো মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপকে স্থিতিশীল করে
খিঁচুনি প্রতিরোধে সাহায্য করে।
(ক) নতুন প্রজন্মের ঔষধ: সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নতুন নতুন AEDs ঔষধের উদ্ভাবন
হয়েছে, যেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম এবং পুরানো ঔষধের তুলনায় আরও কার্যকর। কিছু ক্ষেত্রে
একাধিক ঔষধের সংমিশ্রণ (combination therapy) ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে যাদের ক্ষেত্রে একটি ঔষধ
কাজ করে না।
(খ) ব্যক্তিগতকৃত ঔষধ নির্বাচন: রোগীর খিঁচুনির ধরন, বয়স, লিঙ্গ, অন্যান্য স্বাস্থ্যগত
অবস্থা এবং অন্যান্য ঔষধের সাথে মিথস্ক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসক সঠিক ঔষধটি নির্বাচন করেন।
(গ) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: ঔষধের কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরীক্ষণের জন্য নিয়মিত
ফলো-আপ জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
যখন ঔষধের মাধ্যমে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না (ঔষধ-প্রতিরোধী মৃগীরোগ), তখন
শল্য চিকিৎসার কথা বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতিটি বিশেষত उन রোগীদের জন্য প্রযোজ্য যাদের খিঁচুনি মস্তিষ্কের একটি
নির্দিষ্ট অংশ থেকে শুরু হয় (ফোকাল মৃগীরোগ)।
(ক) লেসিনেক্টমি (Lesionectomy): খিঁচুনির উৎস হিসেবে দায়ী মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক টিস্যু (যেমন
- টিউমার, ক্ষতিকর টিস্যু) অপসারণ করা।
(খ) লোবেক্টমি (Lobectomy): মস্তিষ্কের যে লোব থেকে খিঁচুনি শুরু হয়, সেই লোবের অংশবিশেষ
অপসারণ করা। টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি এর একটি সাধারণ উদাহরণ।
(গ) হেমিস্ফেরেক্টমি (Hemispherectomy): এটি শিশুদের মধ্যে করা হয়, যেখানে মস্তিষ্কের একটি
পুরো গোলার্ধ বা তার একটি বড় অংশ অপসারণ বা নিষ্ক্রিয় করা হয়। এটি সাধারণত গুরুতর খিঁচুনি যা শুধুমাত্র এক পাশের
মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে, সে ক্ষেত্রে করা হয়।
(ঘ) কর্পাস ক্যালোসোটমি (Corpus Callosotomy): মস্তিষ্কের উভয় গোলার্ধকে সংযুক্তকারী স্নায়ু তন্তু
(কর্পাস ক্যালোসাম) কেটে দেওয়া হয়, যাতে এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে খিঁচুনি ছড়িয়ে পড়তে না পারে। এটি সাধারণত
গুরুতর সাধারণীকৃত খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হয়।
(ঙ) লেজার ইন্টারস্টিশিয়াল থার্মাল থেরাপি (LITT): এটি একটি কম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি, যেখানে
এমআরআই নির্দেশিত লেজার ব্যবহার করে মস্তিষ্কের ছোট একটি অংশকে পুড়িয়ে ফেলা হয় যা খিঁচুনি উৎপন্ন করে।
এগুলো মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিবর্তন করে খিঁচুনি কমাতে সাহায্য করে।
(ক) ভেগাস নার্ভ স্টিমুলেশন (Vagus Nerve Stimulation - VNS): এটি একটি ছোট ডিভাইস যা ত্বকের
নিচে বুকের বাম পাশে বসানো হয় এবং একটি তারের মাধ্যমে গলার ভেগাস নার্ভের সাথে সংযুক্ত থাকে। এই ডিভাইসটি ভেগাস নার্ভে
নিয়মিত বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায়, যা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং খিঁচুনির ফ্রিকোয়েন্সি ও তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।
(খ) রেসপনসিভ নিউরোস্টিমুলেশন (Responsive Neurostimulation - RNS): এটি একটি অত্যাধুনিক
পদ্ধতি, যেখানে মস্তিষ্কে বসানো একটি ডিভাইস মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে এবং যখন খিঁচুনির পূর্বাভাস দেয়,
তখন এটি মস্তিষ্কে ছোট বৈদ্যুতিক পালস পাঠিয়ে খিঁচুনি শুরু হওয়ার আগেই তা বন্ধ করে দেয়।
(গ) ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (Deep Brain Stimulation - DBS): মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ইলেকট্রোড স্থাপন
করে এবং একটি ডিভাইস দ্বারা বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি এখনও মৃগীরোগের জন্য
গবেষণাধীন থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এটি একটি উচ্চ চর্বি, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং খুব কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য তালিকা। এই ডায়েট শরীরকে ফ্যাট পোড়াতে বাধ্য করে, যা কিটোন তৈরি করে। কিটোন মস্তিষ্কের জন্য একটি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাজ করে এবং কিছু নির্দিষ্ট ধরনের মৃগীরোগে আক্রান্ত রোগীদের, বিশেষ করে শিশুদের, খিঁচুনি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এটি সাধারণত বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে অনুসরণ করা হয়।
(ক) নিয়মিত ঔষধ গ্রহণ: চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ সেবন
করা অত্যন্ত জরুরি।
(খ) পর্যাপ্ত ঘুম: পর্যাপ্ত ঘুম খিঁচুনি প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের অভাব খিঁচুনিকে ট্রিগার করতে পারে।
(গ) মানসিক চাপ কমানো: যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা অন্যান্য শিথিলকরণ কৌশল মানসিক চাপ কমাতে
সাহায্য করতে পারে, যা খিঁচুনি কমাতে সহায়ক।
(ঘ) অ্যালকোহল ও মাদক পরিহার: অ্যালকোহল এবং কিছু মাদক খিঁচুনিকে ট্রিগার করতে পারে।
(ঙ) সতর্কতা: গাড়ি চালানো, সাঁতার কাটা, উঁচু স্থানে কাজ করা বা বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির সাথে কাজ করার
সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
(চ) সহায়তা দল: মৃগীরোগ আক্রান্তদের জন্য সহায়তা দল (support group) মানসিক সমর্থন এবং অভিজ্ঞতা
ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
(ছ) কাউন্সেলিং: বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক সমস্যা থাকলে কাউন্সেলিং বা থেরাপি সহায়ক হতে পারে।
(জ) টেলিমেডিসিন: আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর থেকেও চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ ও পরামর্শ গ্রহণ সম্ভব
হচ্ছে। আধুনিক যুগে মৃগীরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। একজন নিউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত চিকিৎসা এবং
জীবনযাত্রার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বেশিরভাগ মৃগীরোগীই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। বাংলাদেশেও নিউরোলজিস্টরা এসব
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।