হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হৗয়ার কারণ
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ ?
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে (Hepatitis B Virus – HBV) আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হলো সংক্রমিত রক্ত বা শরীরের তরলের (যেমন বীর্য, যোনি তরল, লালা, ক্ষত থেকে নিঃসৃত রস ইত্যাদি) সংস্পর্শে আসা। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করে।
এখানে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো-
১. রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্যের মাধ্যমে:
ক) আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ: যদি কোনো ব্যক্তি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করেন (যেমন রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে), তাহলে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আধুনিক যুগে রক্ত সঞ্চালনের আগে রক্ত পরীক্ষা করা হয় বলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে।
খ) অসুস্থ ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে আসা: স্বাস্থ্যকর্মী যারা সংক্রমিত রক্ত নিয়ে কাজ করেন (যেমন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাবরেটরিতে), যদি কোনোভাবে তাদের ত্বক কেটে যায় বা সূঁচ ফুটে যায়, তাহলে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. অনিরাপদ সূঁচ বা ধারালো বস্তুর ব্যবহার:
ক) মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সূঁচ ভাগ করে নেওয়া: যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন এবং একই সূঁচ বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
খ) অপরিষ্কার সূঁচ বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার: ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং করার সময় যদি অপরিষ্কার সূঁচ বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, তাহলে সংক্রমণ হতে পারে।
গ) অপরিষ্কার মেডিকেল বা ডেন্টাল যন্ত্রপাতি: কিছু ক্ষেত্রে, যদি হাসপাতালে বা ডেন্টাল ক্লিনিকে ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত না করা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, তবে সংক্রমণ হতে পারে।
৩. যৌন সম্পর্ক:
অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক: হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বীর্য এবং যোনি তরলে থাকতে পারে। তাই সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক (বিশেষ করে একাধিক সঙ্গীর সাথে বা কনডম ব্যবহার না করে) স্থাপনের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে।
৪. আক্রান্ত মা থেকে শিশুর সংক্রমণ (পেরিনেটাল ট্রান্সমিশন):
জন্মের সময় সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে তার নবজাতক শিশুর মধ্যে জন্মের সময় ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। এটি হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের একটি প্রধান কারণ, বিশেষ করে যে দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি বেশি দেখা যায়। এই কারণে গর্ভাবস্থায় মায়েদের হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে শিশুকে জন্মের পরপরই টিকা ও ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
৫. ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভাগ করে নেওয়া:
আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত জিনিস ব্যবহার: এমন কিছু ব্যক্তিগত জিনিস যা রক্তের সংস্পর্শে আসতে পারে, যেমন রেজার (ক্ষুর), টুথব্রাশ, নেইল ক্লিপার ইত্যাদি, যদি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ভাগ করে নেওয়া হয়, তাহলে সংক্রমণ হতে পারে। তবে এই ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
হেপাটাইটিস বি কীভাবে ছড়ায় না?
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নিচের উপায়ে ছড়ায় না:
ক) আলিঙ্গন বা হাত মেলানোর মাধ্যমে।
খ) একই বাথরুম ব্যবহার করার মাধ্যমে।
গ) একই থালা-বাসন ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে।
ঘ) হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে।
ঙ) খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে।
চ) মশা বা অন্যান্য পোকামাকড়ের কামড়ের মাধ্যমে।
প্রতিরোধ:
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলো হলো:
১) টিকা গ্রহণ: হেপাটাইটিস বি এর বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ টিকা পাওয়া যায়।
২) সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক: কনডম ব্যবহার করে সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা।
৩) সূঁচ ভাগ না করা: ইনজেকশনের জন্য ব্যবহৃত সূঁচ বা সিরিঞ্জ কারো সাথে ভাগ না করা।
৪) ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: রেজার, টুথব্রাশের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্য কারো সাথে ভাগ না করা।
৫) স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্কতা: স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সার্বজনীন সতর্কতা মেনে চলা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করা।
যদি হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হন।