হিমোফিলিয়া একটি গুরুতর জিনগত রক্তের রোগ যেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত হয়। এই রোগের প্রধান সমস্যাগুলো রক্তপাতের ধরন এবং এর দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা থেকে আসে। হিমোফিলিয়া আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যা রোগের তীব্রতার উপর নির্ভরশীল:
(ক) বাহ্যিক রক্তপাত: সামান্য আঘাত, কাটাছেঁড়া, দাঁত তোলা, অস্ত্রোপচার
বা ইনজেকশনের পরেও অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে যা সহজে বন্ধ হয় না। নাক বা মাড়ি থেকে ঘন ঘন রক্তপাত হয়।
(খ) স্বতঃস্ফূর্ত রক্তপাত: গুরুতর হিমোফিলিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে কোনো আপাত কারণ ছাড়াই রক্তপাত হতে পারে।
(গ) কালশিটে পড়া: সামান্য আঘাতেই ত্বকের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে বড় বা গভীর কালশিটে (hematoma)
পড়তে পারে।
এটি হিমোফিলিয়ার সবচেয়ে সাধারণ এবং গুরুতর জটিলতা। সাধারণত হাঁটু, কনুই, গোড়ালি এবং কাঁধের মতো
বড় জয়েন্টগুলোতে রক্ত জমা হয়।
(ক) উপসর্গ: তীব্র ব্যথা, ফোলা, উষ্ণতা এবং জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া।
(খ) দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি: বারবার জয়েন্টে রক্তপাত হলে জয়েন্টের কার্টিলেজ এবং হাড়ের স্থায়ী ক্ষতি হয়, যা "হিমোফিলিক
আর্থ্রোপ্যাথি" নামে পরিচিত। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, জয়েন্টের নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতা, অঙ্গবিকৃতি এবং এমনকি অক্ষমতা দেখা দিতে পারে।
পেশীর গভীরে রক্তপাত (intramuscular hematoma) হলে ব্যথা, ফোলা এবং অসাড়তা হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুর উপর রক্তপাতের চাপ পড়লে স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে, যার ফলে সেই অঙ্গে দুর্বলতা বা অসাড়তা দেখা দিতে পারে।
(ক) মস্তিষ্কে রক্তপাত (Intracranial Hemorrhage): এটি হিমোফিলিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক
জটিলতা এবং এটি জীবন-হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। সামান্য মাথায় আঘাত বা এমনকি কোনো আঘাত ছাড়াই এটি ঘটতে পারে। এর লক্ষণগুলো হলো
তীব্র মাথাব্যথা, বমি, ঘুমঘুম ভাব, খিঁচুনি, হঠাৎ দুর্বলতা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস বা ভারসাম্যহীনতা।
(খ) পাকস্থলী বা অন্ত্রে রক্তপাত: এর ফলে মল বা মূত্রের সাথে রক্ত দেখা যেতে পারে।
(গ) গলা বা ঘাড়ে রক্তপাত: এটি শ্বাসনালীতে চাপ সৃষ্টি করে শ্বাস-প্রশ্বাসে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে, যা একটি
জরুরি অবস্থা।
কিছু হিমোফিলিয়া রোগীর ক্ষেত্রে, নিয়মিত ফ্যাক্টর থেরাপি নেওয়ার পর তাদের ইমিউন সিস্টেম সেই ফ্যাক্টরের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যাকে "ইনহিবিটর" বলা হয়। এই ইনহিবিটরগুলো ইনজেকশন করা ফ্যাক্টরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটি হিমোফিলিয়ার সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি।
অতীতে, যখন রক্তরস থেকে প্রাপ্ত ফ্যাক্টর পণ্য ভাইরাস নিষ্ক্রিয়করণ ছাড়াই ব্যবহার করা হতো, তখন হেপাটাইটিস (যেমন হেপাটাইটিস C) এবং HIV-এর মতো রক্তবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি ছিল। যদিও এখন রিকম্বিন্যান্ট ফ্যাক্টর এবং উন্নত স্ক্রিনিং পদ্ধতির কারণে এই ঝুঁকি অনেক কমে গেছে, তবুও এটি একটি ঐতিহাসিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ঘন ঘন রক্তপাত, চিকিৎসার ধকল, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সীমাবদ্ধতা এবং অক্ষমতার ভয় রোগীদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।