+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (Polycystic Kidney Disease - PKD):

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (Polycystic Kidney Disease - PKD) একটি জেনেটিক রোগ যেখানে কিডনিতে অসংখ্য তরলপূর্ণ সিস্ট তৈরি হয়। সময়ের সাথে সাথে এই সিস্টগুলো বড় হতে থাকে এবং কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। এটি শেষ পর্যায়ের কিডনি ব্যর্থতার (End-Stage Renal Disease - ESRD) অন্যতম প্রধান কারণ, যার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।


১। প্রকারভেদ:

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ মূলত দুই ধরনের হয়-

(১) অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (Autosomal Dominant Polycystic Kidney Disease - ADPKD):
এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার এবং সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, যদিও এটি যেকোনো বয়সে শুরু হতে পারে।
এই রোগের জন্য PKD1 এবং PKD2 নামক জিনের মিউটেশন দায়ী।
যদি বাবা-মায়ের মধ্যে কারো ADPKD থাকে, তাহলে তাদের সন্তানদের এই রোগ হওয়ার ৫০% সম্ভাবনা থাকে।
পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই সমানভাবে আক্রান্ত হতে পারে।

(২) অটোসোমাল রিসেসিভ পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (Autosomal Recessive Polycystic Kidney Disease - ARPKD):
এটি তুলনামূলকভাবে বিরল এবং সাধারণত শৈশব বা শিশুকাল থেকেই দেখা যায়, এমনকি জন্মগতভাবেও থাকতে পারে।
PKHD1 জিনের মিউটেশনের কারণে এটি হয়।
এই রোগটি হওয়ার জন্য শিশুকে অবশ্যই বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে পরিবর্তিত জিনের দুটি কপি উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে হবে।

২। কারণ

PKD এর প্রধান কারণ হলো জেনেটিক মিউটেশন। প্রায়শই এটি বাবা-মা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি স্বতঃস্ফূর্ত মিউটেশনের কারণেও হতে পারে (প্রায় ১০% ক্ষেত্রে)।

৩। লক্ষণ ও উপসর্গ

PKD-এর লক্ষণগুলি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং সাধারণত ৩০-৪০ বছর বয়সে বেশি প্রকাশ পায়। কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:

(ক) উচ্চ রক্তচাপ: এটি PKD-এর সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে একটি। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
(খ) পিঠে বা পাশে ব্যথা: বিশেষ করে নিচের পিঠে অবিরাম ব্যথা অনুভব করা যায়। কিডনি বড় হওয়ার কারণে পেটের আকারও বৃদ্ধি পেতে পারে।
(গ) প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria): প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া (গোলাপী, লাল বা কোলা রঙের হতে পারে)।
(ঘ) ঘন ঘন মূত্রনালীর সংক্রমণ (Urinary Tract Infection - UTI) বা কিডনি সংক্রমণ: সিস্টের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
(ঙ) কিডনি পাথর: সিস্টের কারণে কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
(চ) অবসাদ: কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব হতে পারে।
(ছ) বমি বমি ভাব ও বমি: কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমা হওয়ার কারণে এই লক্ষণগুলো দেখা যায়।
(জ) শোথ (Edema): হাত, পা বা মুখে ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে।

৪। জটিলতা

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ বিভিন্ন জটিলতার কারণ হতে পারে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

(ক) কিডনি ব্যর্থতা (Kidney Failure): সময়ের সাথে সাথে কিডনির কার্যক্ষমতা এতটাই কমে যায় যে কিডনি শরীরের বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করতে পারে না, যার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। প্রায় অর্ধেক PKD আক্রান্ত রোগী ৬০ বছর বয়সের মধ্যে কিডনি ব্যর্থতার সম্মুখীন হন।
(খ) লিভারে সিস্ট: কিডনির পাশাপাশি লিভার এবং অন্যান্য অঙ্গেও সিস্ট তৈরি হতে পারে।
(গ) মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম (Cerebral Aneurysm): মস্তিষ্কের রক্তনালীতে অস্বাভাবিক স্ফীতি হতে পারে, যা ফেটে গেলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
(ঘ) উচ্চ রক্তচাপ: যা কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
(ঙ) হার্টের সমস্যা: হৃদপিণ্ডের ভালভে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।

৫। রোগ নির্ণয়

PKD নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়:

(ক) পারিবারিক ইতিহাস: রোগের পারিবারিক ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(খ) রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা: রক্তে ক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়ার মাত্রা এবং প্রস্রাবে প্রোটিন বা রক্তের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
(গ) ইমেজিং পরীক্ষা: আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে কিডনির সিস্টগুলো চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের আকার ও সংখ্যা মূল্যায়ন করা হয়।
(ঘ) জেনেটিক টেস্টিং: নির্দিষ্ট জিনের মিউটেশন শনাক্ত করার জন্য জেনেটিক পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৬। চিকিৎসা

পলিসিস্টিক কিডনি রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই যা সিস্টগুলোকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে পারে। তবে, এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং জটিলতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়:

(ক) উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কিডনির ক্ষতির অগ্রগতি ধীর করতে সাহায্য করে। ডাক্তার দ্বারা নির্ধারিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(খ) ব্যথা ব্যবস্থাপনা: ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করে পিঠে বা পাশের ব্যথা কমানো যায়।
(গ) সংক্রমণ চিকিৎসা: মূত্রনালীর বা কিডনির সংক্রমণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দ্রুত চিকিৎসা করা উচিত।
(ঘ) স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: লবণ, প্রোটিন এবং চর্বি কমিয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাও জরুরি।
(ঙ) জীবনযাত্রার পরিবর্তন: ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা উপকারী।
(চ) রুটিন চেক-আপ: কিডনির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
(ছ) কিডনি ব্যর্থতার ক্ষেত্রে: শেষ পর্যায়ে কিডনি ব্যর্থতা হলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে।

৭। প্রতিরোধ

যেহেতু PKD একটি জেনেটিক রোগ, তাই এটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে, জেনেটিক কাউন্সেলিং পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত করতে এবং রোগ পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। sssউচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ জীবনযাপন করে রোগের জটিলতাগুলো কমানো সম্ভব।