+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

জন্মগত কিডনি রোগ:

কিছু শিশু জন্ম থেকেই কিডনির সমস্যা নিয়ে জন্মায়, যেমন - কিডনির গঠনগত ত্রুটি, বা কিডনির কার্যক্ষমতার অভাব। জন্মগত কিডনি রোগ বলতে সেই সমস্ত সমস্যাকে বোঝায় যা নিয়ে শিশুরা জন্মগতভাবে আসে, অর্থাৎ মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়েই কিডনির গঠন বা কার্যক্ষমতার ত্রুটি দেখা দেয়। এই ধরনের রোগ বিভিন্ন মাত্রার হতে পারে, যা হালকা থেকে গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি শিশুর জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, এমনকি শেষ পর্যায়ে কিডনি রোগের (ESRD) কারণ হতে পারে।


১। জন্মগত কিডনি রোগের কারণ:

জন্মগত কিডনি রোগের প্রধান কারণগুলো হলো:

(১) জেনেটিক বা বংশগত কারণ: কিছু কিডনি রোগ জিনগত ত্রুটির কারণে ঘটে, যা পরিবারে প্রবাহিত হতে পারে। যেমন:
(২) পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (PKD): এটি এক ধরনের বংশগত রোগ যেখানে কিডনিতে অসংখ্য সিস্ট (তরল ভর্তি থলি) তৈরি হয়। এর দুটি প্রধান প্রকার আছে:
(৩) অটোসোমাল ডমিনেন্ট পিকেডি (ADPKD): এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে শিশুদেরও হতে পারে।
(৪) অটোসোমাল রিসেসিভ পিকেডি (ARPKD): এটি শিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে নবজাতকদের মধ্যে বেশি গুরুতর এবং এটি জন্মের পরপরই গুরুতর কিডনি ফেইলিউরের কারণ হতে পারে।
(৫) অ্যালপোর্ট সিন্ড্রোম (Alport Syndrome): এটি কিডনির গ্লোমেরুলিতে (ফিল্টার) সমস্যা সৃষ্টি করে, যা সময়ের সাথে সাথে কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। এটি সাধারণত শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং চোখের সমস্যাও সৃষ্টি করে।
(৬) কনজেনিটাল নেফ্রোটিক সিনড্রোম: এই ক্ষেত্রে কিডনির ছাঁকনি (ফিল্টার) বড় হয়ে যায়, যার ফলে প্রস্রাবের সাথে অত্যাধিক প্রোটিন বেরিয়ে যায়।

২। কিডনির গঠনগত ত্রুটি (Congenital Anomalies of the Kidney and Urinary Tract - CAKUT):

এগুলো হলো জন্মগত ত্রুটি যা কিডনি এবং মূত্রনালীর গঠনকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে কিছু সাধারণ ত্রুটি হলো কিডনির গঠনগত অস্বাভাবিকতা:

(১) কিডনি অ্যাজেনেসিস (Renal Agenesis): একটি বা উভয় কিডনির অনুপস্থিতি। উভয় কিডনি অনুপস্থিত থাকলে তা জীবনের জন্য মারাত্মক।
(২) কিডনি হাইপোপ্লাসিয়া (Renal Hypoplasia): কিডনির আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হওয়া এবং এতে নেফ্রনের (কিডনির কার্যকরী একক) সংখ্যা কম থাকা।
(৩) কিডনি ডিসপ্লাসিয়া (Renal Dysplasia): কিডনির টিস্যু সঠিকভাবে গঠিত না হওয়া। এটি একক কিডনিতেও হতে পারে, বা উভয় কিডনিকেই প্রভাবিত করতে পারে।
(৪) হর্সশু কিডনি (Horseshoe Kidney): যেখানে দুটি কিডনি নিচের দিকে যুক্ত হয়ে ঘোড়ার খুরের মতো আকার ধারণ করে।

৩। মূত্রনালীর অস্বাভাবিকতা:

(১) ভেসিকোইউরেটেরাল রিফ্লাক্স (Vesicoureteral Reflux - VUR): এই অবস্থায় প্রস্রাব মূত্রাশয় থেকে মূত্রনালীর মাধ্যমে কিডনিতে ফিরে আসে। এর ফলে কিডনিতে সংক্রমণ এবং ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
(২) পোস্টেরিয়র ইউরেথ্রাল ভালভ (Posterior Urethral Valve - PUV): এটি শুধুমাত্র ছেলেদের হয়, যেখানে মূত্রনালীতে একটি অতিরিক্ত টিস্যুর ভাঁজ থাকে যা প্রস্রাবের প্রবাহকে বাধা দেয়। এর ফলে মূত্রাশয় এবং কিডনিতে চাপ পড়ে এবং কিডনির ক্ষতি হয়।
(গ) ইউরেটেরোপেলভিক জাংশন অবস্ট্রাকশন (Ureteropelvic Junction Obstruction - UPJO): এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে কিডনি থেকে মূত্রনালীতে প্রস্রাবের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
(ঘ) হাইড্রোনফ্রোসিস (Hydronephrosis): কিডনির ভিতরে প্রস্রাব জমে কিডনির ফুলে যাওয়া। এটি মূত্রনালীর বাধার কারণে হতে পারে এবং প্রায়শই মায়ের গর্ভে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়।
(ঙ) মায়ের স্বাস্থ্যগত অবস্থা: গর্ভাবস্থায় মায়ের কিছু রোগ বা ঔষধের ব্যবহার শিশুর কিডনির বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

৪। জন্মগত কিডনি রোগের লক্ষণ:

জন্মগত কিডনি রোগের লক্ষণগুলো শিশুর বয়স এবং রোগের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, গর্ভে থাকাকালীন সময়ে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে এটি সনাক্ত করা যায়। জন্মের পর যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে-

(১) ফোলাভাব: চোখ, মুখ, পা বা পেটে ফোলাভাব (জল জমার কারণে)।
(২) প্রস্রাবের সমস্যা: ঘন ঘন প্রস্রাব বা খুব কম প্রস্রাব হওয়া। ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব হওয়া (ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রস্রাব দূরে না যাওয়া)। প্রস্রাবে রক্ত বা অস্বাভাবিক রঙ। প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া।
(৩) খাবারে অনীহা এবং দুর্বল বৃদ্ধি: অপুষ্টির কারণে ওজন বৃদ্ধি না হওয়া।
(৪) ক্লান্তি এবং দুর্বলতা: কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে।
(৫) ঘন ঘন জ্বর: মূত্রনালীর সংক্রমণের কারণে।
(৬) রক্তচাপ বৃদ্ধি: শিশুদেরও উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।
(৭) রক্তস্বল্পতা: কিডনি থেকে এরিথ্রোপোয়েটিন নামক হরমোন কমে যাওয়ার কারণে।
(৮) পেটের নিচের অংশে ফোলা বা চাকা: কিডনিতে সিস্ট বা প্রস্রাব জমার কারণে।

৫। রোগ নির্ণয়:

জন্মগত কিডনি রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়-

(১) প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড (Prenatal Ultrasound): গর্ভাবস্থায় এই পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক জন্মগত কিডনি ত্রুটি সনাক্ত করা যায়, যেমন হাইড্রোনেফ্রোসিস বা কিডনির গঠনগত অস্বাভাবিকতা।

৬। জন্মের পর পরীক্ষা:

(১) রক্ত পরীক্ষা: ক্রিয়েটিনিন, ইউরিয়া এবং ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রা পরীক্ষা করে কিডনির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়।
(২) প্রস্রাব পরীক্ষা: প্রস্রাবে প্রোটিন, রক্ত বা সংক্রমণের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
(৩) আল্ট্রাসাউন্ড: কিডনির আকার, গঠন এবং কোনো সিস্ট বা বাধার উপস্থিতি দেখতে।
(৪) ভয়েডিং সিস্টোইউরেথ্রোগ্রাম (VCUG): এটি একটি বিশেষ এক্স-রে পরীক্ষা যা ভেসিকোইউরেটেরাল রিফ্লাক্স (VUR) সনাক্ত করতে সাহায্য করে।
(৫) কিডনি বায়োপসি: কিছু ক্ষেত্রে কিডনির টিস্যুর একটি ছোট নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

৭। চিকিৎসা

জন্মগত কিডনি রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে ত্রুটির ধরন, তীব্রতা এবং শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। কিছু ক্ষেত্রে, ত্রুটিগুলো গুরুতর না হলে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে রয়েছে:

(১) ঔষধ: সংক্রমণ প্রতিরোধ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বা শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ঔষধ ব্যবহার করা হয়।
(২) সার্জারি: গঠনগত ত্রুটিগুলো সংশোধন করার জন্য অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে, যেমন মূত্রনালীর বাধা অপসারণ (PUV বা UPJO) বা VUR সংশোধন।
(৩) নিয়মিত ফলো-আপ: কিডনির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ এবং যেকোনো জটিলতা প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
(৪) ডায়েটরি ম্যানেজমেন্ট: পুষ্টিবিদদের পরামর্শে শিশুর খাদ্য পরিকল্পনা করা হয়, যাতে কিডনির ওপর চাপ কম পড়ে এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত হয়।
(৫) ডায়ালাইসিস: যদি কিডনির কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে হ্রাস পায় এবং এন্ড-স্টেজ রেনাল ডিজিজ (ESRD) দেখা দেয়, তখন ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।
(৬) কিডনি প্রতিস্থাপন: ESRD-এর চূড়ান্ত চিকিৎসা হলো কিডনি প্রতিস্থাপন, যেখানে একজন সুস্থ দাতার কিডনি শিশুর শরীরে স্থাপন করা হয়। জন্মগত কিডনি রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পিতামাতাদের শিশুদের প্রস্রাব এবং সাধারণ স্বাস্থ্যগত কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।