লিভার সিস্ট হলো লিভারে তরল-ভরা থলি বা ছোট আকারের সিস্ট, যা অনেকটা পানির বেলুনের মতো দেখতে। এগুলো সাধারণত নিরীহ (বেনাইন) হয় এবং বেশিরভাগ সময়ই কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। প্রায়শই অন্যান্য রোগের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান করার সময় দুর্ঘটনাক্রমে এগুলো ধরা পড়ে। যদিও বেশিরভাগ লিভার সিস্ট ক্ষতিকর নয়, কিছু ক্ষেত্রে এগুলো বড় আকার ধারণ করলে ব্যথা বা অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
লিভার সিস্ট বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যার মধ্যে কিছু সাধারণ প্রকার নিচে দেওয়া হলো:
সংজ্ঞা: এগুলো লিভারের সবচেয়ে সাধারণ ধরণের সিস্ট।
এগুলো একক, পাতলা দেয়ালযুক্ত এবং পরিষ্কার, তরল দিয়ে পূর্ণ থাকে।
কারণ: এর সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয় যে এগুলো জন্মগত ত্রুটির
কারণে হতে পারে, যেখানে পিত্তনালীর ক্ষুদ্র অংশগুলো স্বাভাবিক লিভারের সাথে সংযুক্ত হতে পারে না।
* প্রকৃতি: ৯০-৯৫% লিভার সিস্টই সাধারণ ধরণের এবং সাধারণত কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। এগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে বড় হয়।
লক্ষণ: বেশিরভাগ সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে যদি সিস্ট খুব বড় হয়ে যায়,
তবে পেটের উপরের ডানদিকে ব্যথা, ফোলাভাব, বমি বমি ভাব, বা পেটে চাপ অনুভব হতে পারে।
সংজ্ঞা: এটি একটি জেনেটিক অবস্থা যেখানে লিভারে একাধিক সিস্ট তৈরি হয়, যার সংখ্যা শত শত থেকে হাজার হাজার পর্যন্ত হতে পারে। PLD প্রায়শই পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (Polycystic Kidney Disease - PKD) এর সাথে সম্পর্কিত, যেখানে কিডনিতেও সিস্ট তৈরি হয়। কারণ: এটি একটি বংশগত রোগ যা জিনের ত্রুটির কারণে ঘটে। প্রকৃতি: সিস্টের সংখ্যা এবং আকার সময় বাড়ার সাথে সাথে বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিভারের কার্যকারিতা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, যদিও সিস্টগুলো খুব বড় হয়ে গেলে পেটে ব্যাপক অস্বস্তি বা ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। খুব বিরল ক্ষেত্রে লিভার ফেইলিওর হতে পারে। লক্ষণ: পেটে ব্যথা, ফোলাভাব, পেট ভরা ভরা লাগা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট (যদি সিস্ট ডায়াফ্রামের উপর চাপ সৃষ্টি করে)।
সংজ্ঞা: এগুলো এক ধরণের সিস্ট যা ইকিনোকক্কাস (Echinococcus) নামক এক ধরণের পরজীবী (টেপওয়ার্ম) দ্বারা সৃষ্ট হয়। এই পরজীবী সাধারণত কুকুর, ভেড়া বা অন্যান্য প্রাণীর মলে পাওয়া যায়। কারণ: দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে এই পরজীবীর ডিম মানবদেহে প্রবেশ করলে সিস্ট তৈরি হতে পারে। প্রকৃতি: এই সিস্টগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে, যেমন লিভার, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ইত্যাদি স্থানে তৈরি হতে পারে। এগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। লক্ষণ: পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, জ্বর, জন্ডিস। সিস্ট ফেটে গেলে গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া বা এমনকি অ্যানাফিল্যাকটিক শক হতে পারে।
সংজ্ঞা: এগুলো এক ধরণের সিস্ট যা টিউমার থেকে উৎপন্ন হয়। যদিও বেশিরভাগ
সিস্টিক টিউমার বেনাইন (যেমন বিলিয়ারি সিস্টাডেনোমা), কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সারযুক্ত) হতে পারে, যাকে সিস্টাডেনোকার্সিনোমা বলা হয়।
প্রকৃতি: এই সিস্টগুলো সাধারণত সাধারণ সিস্টের চেয়ে বেশি জটিল এবং তাদের দেয়াল ঘন বা বিভাজিত হতে পারে।
এদের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিশেষ করে যদি আকারে বড় হয় বা সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়।
লক্ষণ: পেটে ব্যথা, ফোলাভাব, জন্ডিস।
বেশিরভাগ লিভার সিস্টই ছোট থাকে এবং কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। যখন লক্ষণ দেখা দেয়, তখন সাধারণত
সিস্টের আকার অনেক বড় হয়ে যায় বা কোনো জটিলতা তৈরি হয়। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
(১) পেটের উপরের ডানদিকে ব্যথা বা অস্বস্তি: সিস্ট বড় হওয়ার কারণে লিভারে চাপ সৃষ্টি হলে এই ব্যথা হতে পারে।
(২) পেটে ফোলাভাব বা ভারি অনুভব: বিশেষ করে বড় সিস্টের কারণে পেট ফুলে যেতে পারে।
(৩) ক্ষুধামন্দা বা দ্রুত পেট ভরা অনুভব: সিস্ট পাকস্থলীর উপর চাপ সৃষ্টি করলে এমন হতে পারে।
(৪) বমি বমি ভাব বা বমি: বিশেষ করে বড় সিস্টের ক্ষেত্রে।
(৫) শ্বাসকষ্ট: যদি সিস্ট ডায়াফ্রামের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
(৬) জন্ডিস (বিরল): যদি সিস্ট পিত্তনালীকে ব্লক করে, তাহলে জন্ডিস হতে পারে।
(৭) জ্বর (বিরল): যদি সিস্টে সংক্রমণ হয়।
(৮) রক্তপাত (বিরল): সিস্টের মধ্যে রক্তপাত হলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হতে পারে।
লিভার সিস্ট সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়:
(ক) আল্ট্রাসাউন্ড: এটি সাধারণত প্রথম পরীক্ষা যা সিস্ট সনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়।
(খ) সিটি স্ক্যান (CT Scan): সিস্টের আকার, অবস্থান এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেয়।
(গ) এমআরআই (MRI): জটিল সিস্ট বা পিত্তনালীর সাথে সম্পর্কিত সিস্টের ক্ষেত্রে এটি আরও বিস্তারিত চিত্র দিতে পারে।
(ঘ) রক্ত পরীক্ষা: হাইডাটিড সিস্ট সন্দেহ হলে পরজীবীর উপস্থিতি পরীক্ষার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা যেতে পারে। ক্যান্সার
সন্দেহ হলে টিউমার মার্কার (যেমন CA 19-9) পরীক্ষা করা হতে পারে।
(ঙ) বায়োপসি: খুব বিরল ক্ষেত্রে, যদি সিস্টের ক্যান্সার হওয়ার সন্দেহ থাকে, তবে বায়োপসি করে টিস্যু পরীক্ষা করা হয়।
বেশিরভাগ লিভার সিস্টের জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না, বিশেষ করে যদি সেগুলো ছোট হয় এবং
কোনো লক্ষণ সৃষ্টি না করে। এই ক্ষেত্রে, চিকিৎসক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (যেমন প্রতি ৬-১২ মাস অন্তর আল্ট্রাসাউন্ড করে সিস্টের আকার পর্যবেক্ষণ)
সুপারিশ করতে পারেন। তবে, যদি সিস্ট বড় হয় এবং লক্ষণ সৃষ্টি করে বা কোনো জটিলতা দেখা দেয় (যেমন সংক্রমণ, রক্তপাত, বা ক্যান্সার সন্দেহ),
তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে:
(১) ড্রেনেজ (Drainage): একটি সূঁচ ব্যবহার করে সিস্ট থেকে তরল বের করে দেওয়া হয়। এটি সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড বা
সিটি স্ক্যানের নির্দেশনায় করা হয়। তবে, এটি একটি অস্থায়ী সমাধান, কারণ সিস্ট আবার তরল দিয়ে পূর্ণ হতে পারে।
(২) স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy): ড্রেনেজের পর সিস্টের মধ্যে একটি রাসায়নিক পদার্থ (যেমন অ্যালকোহল) ইনজেকশন
দেওয়া হয় যাতে সিস্টের দেয়ালগুলো একসাথে লেগে যায় এবং তরল পুনরায় জমতে না পারে।
(ক) ল্যাপারোস্কোপিক আনরুফিং (Laparoscopic Unroofing): এটি একটি minimally invasive
পদ্ধতি যেখানে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা এবং যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে সিস্টের উপরের অংশ (ছাদ) অপসারণ করা হয় যাতে তরল বের হয়ে যায় এবং সিস্ট
আর পূর্ণ হতে না পারে। এটি বড় বা লক্ষণযুক্ত সাধারণ সিস্টের জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।
(খ) আংশিক লিভার রিসেকশন (Partial Liver Resection): যদি সিস্ট খুব বড় হয়, জটিল হয়, বা ক্যান্সার সন্দেহ থাকে, তবে
লিভারের কিছু অংশ অপসারণ করার প্রয়োজন হতে পারে।
(গ) ঔষধ: হাইডাটিড সিস্টের ক্ষেত্রে পরজীবী মারার জন্য অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ঔষধ (যেমন অ্যালবেনডাজল) ব্যবহার করা হয়।
(ঘ) লিভার প্রতিস্থাপন (Liver Transplant): পলিসিস্টিক লিভার ডিজিজের খুব গুরুতর ক্ষেত্রে, যেখানে লিভারের কার্যকারিতা
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্যান্য চিকিৎসা অকার্যকর হয়, সেখানে লিভার প্রতিস্থাপন একটি বিকল্প হতে পারে। লিভার সিস্ট সাধারণত গুরুতর নয়,
কিন্তু যদি লিভারের অংশে কোনো অস্বস্তি বা অস্বাভাবিক লক্ষণ অনুভব করেন, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক আপনার অবস্থা
নির্ণয় করে উপযুক্ত পদক্ষেপের সুপারিশ করবেন।