লুপাস (Systemic Lupus Erythematosus - SLE) রোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং এর নামকরণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
লুপাস শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ "লুপাস" থেকে, যার অর্থ "নেকড়ে"। ধারণা করা হয়, ১৩শ শতাব্দীতে কিছু রোগীর মুখে এক ধরনের ফুসকুড়ি দেখা যেত, যা নেকড়ের কামড়ের মতো মনে হতো। এই কারণে রোগটির এমন নামকরণ করা হয়। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, নেকড়ের মুখ বা নাকের চারপাশে যেমন লালচে আভা থাকে, তেমনই কিছু লুপাস রোগীর ত্বকে, বিশেষত মুখে প্রজাপতির আকৃতির ফুসকুড়ি দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্য থেকেই এর নামকরণ "লুপাস" হয়েছে। "এরিথেমাটোসাস" শব্দটিও গ্রিক "এরিথেমা" থেকে এসেছে, যার অর্থ "লাল" বা "প্রদাহ"।
(ক) ১১৮০ খ্রিস্টাব্দ: জানা যায়, ইতালীয় চিকিৎসক রজারিয়াস (Rogerius) সম্ভবত
সর্বপ্রথম লুপাস সদৃশ কিছু ত্বকের সমস্যার কথা বর্ণনা করেন, যা মুখে দেখা যেত এবং নেকড়ের কামড়ের মতো দেখাত।
(খ) ১৮শ শতক: এই সময়ে কিছু চিকিৎসক ত্বকের প্রদাহজনক অবস্থার বর্ণনা দেন, যার মধ্যে "এরিসিপেলাস"
(Erysipelas) এবং "লুপাস" শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। তবে তখনো লুপাসকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
(গ) ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দ: ফরাসি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ পিয়েরি কাজাভে (Pierre Cazenave) লুপাসকে একটি স্বতন্ত্র চর্মরোগ
হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি লুপাস এরিথেমাটোসাস শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এর ত্বকের লক্ষণগুলোকে বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
(ঘ) ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ: ভিয়েনার চিকিৎসক ফার্ডিনান্ড ফন হেব্রা (Ferdinand von Hebra) লুপাসকে "লুপাস
এরিথেমাটোসাস" নামে নামকরণ করেন এবং এটিকে ত্বকের একটি নির্দিষ্ট অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
(ক) ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ: উইয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরিশ্ কাপাশি (Moritz Kaposi) প্রথম লক্ষ্য করেন যে লুপাস কেবল ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও প্রভাবিত করতে পারে। তিনি এই ধারণার প্রস্তাব করেন যে লুপাস একটি "সিস্টেমিক" (শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করে এমন) রোগ, এবং ত্বকের লক্ষণগুলো এই বড় রোগেরই একটি অংশ মাত্র। এই আবিষ্কার লুপাসের চিকিৎসায় একটি বিশাল পরিবর্তন আনে।
(খ) ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ: স্যার উইলিয়াম ওসলার (Sir William Osler), একজন বিখ্যাত আমেরিকান চিকিৎসক, লুপাসের বিস্তৃত সিস্টেমিক প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে লুপাস কেবলমাত্র ত্বকের রোগ নয়, এটি হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং রক্তকণিকাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তার গবেষণার ফলে "সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস" (SLE) নামটি প্রচলিত হয়।
(ক) ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ: বিজ্ঞানীরা "LE সেল" (Lupus Erythematosus cell) আবিষ্কার করেন। এই কোষটি লুপাস নির্ণয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং রোগটি সম্পর্কে আরও গভীর গবেষণা শুরু হয়।
(খ) ১৯৫০-এর দশক: "অ্যান্টি-নিউক্লিয়ার অ্যান্টিবডি" (ANA) আবিষ্কার হয়। ANA টেস্ট লুপাস নির্ণয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে কর্টিকোস্টেরয়েড, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ড্রাগ (যেমন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন) এবং ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ঔষধগুলো লুপাস চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
(গ) ১৯৭০-এর দশক: লুপাস নিয়ে গবেষণা আরও জোরালো হয় এবং বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়। লুপাস ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
(ঘ) ২০০০-এর দশক ও বর্তমান: জৈবিক থেরাপি (Biologic Therapy) বা বায়োলজিক ড্রাগস (যেমন বেলিমুম্যাব - Belimumab) লুপাসের চিকিৎসায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই ঔষধগুলো ইমিউন সিস্টেমের নির্দিষ্ট পথগুলিকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যা প্রচলিত চিকিৎসার চেয়ে আরও কার্যকর হতে পারে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে। জেনেটিক গবেষণা লুপাসের কারণ এবং ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে লুপাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং তাদের আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮০% এরও বেশি আক্রান্ত ব্যক্তি ১৫ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারেন।
লুপাসের ইতিহাস মানবদেহের জটিলতা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির একটি দৃষ্টান্ত। এটি কেবল একটি ত্বকের রোগ থেকে একটি জটিল সিস্টেমিক অটোইমিউন রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গবেষক ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে, যা লুপাস রোগীদের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে। যদিও এর কোনো নিরাময় নেই, আধুনিক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই একটি পূর্ণ ও কার্যকরী জীবন যাপন করতে পারেন।