পুরুষ বন্ধ্যাত্ব শুধু শুক্রাণু-সংক্রান্ত, হরমোনজনিত বা গঠনগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জীবনযাত্রার অভ্যাস, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং বাহ্যিক কিছু কারণও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
কিছু সংক্রমণ পুরুষের প্রজননতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে,
যা শুক্রাণু উৎপাদন বা তার পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে।
(ক) যৌন সংক্রামিত রোগ (STIs): গনোরিয়া (Gonorrhea) এবং ক্ল্যামিডিয়া (Chlamydia)
হলো সবচেয়ে সাধারণ দুটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সংক্রমণ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণগুলো শুক্রাণু বহনকারী
নালীতে (যেমন, এপিডিডাইমিস) প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরে স্থায়ী ব্লকেজ তৈরি করে। এর ফলে শুক্রাণু বীর্যের
সাথে মিশতে পারে না, যা অবস্ট্রাকটিভ অ্যাজোস্পার্মিয়ার কারণ হয়।
(খ) প্রোস্টেটের প্রদাহ (Prostatitis): প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ বীর্যের গুণগত মান কমিয়ে
দিতে পারে। এটি বীর্যে শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) বাড়িয়ে দেয়, যা শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং কার্যকারিতা নষ্ট করে।
(গ) মাম্পস (Mumps): শৈশবে মাম্পস (বিশেষ করে যদি যৌবনে হয়) অণ্ডকোষে প্রদাহ
সৃষ্টি করতে পারে (Orchitis)। এর ফলে অণ্ডকোষের টিস্যু স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা শুক্রাণু উৎপাদনকে
ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়।
এটি পুরুষ বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এর মধ্যে রয়েছে:
(ক) কম শুক্রাণু উৎপাদন (Oligospermia): বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকা।
এর ফলে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত শুক্রাণু থাকে না।
(খ) শুক্রাণুর গতিশীলতার অভাব (Asthenozoospermia): শুক্রাণুর সাঁতার কাটার বা নড়াচড়ার
ক্ষমতা কম থাকা। এর ফলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পারে না।
(গ) শুক্রাণুর অস্বাভাবিক আকার (Teratozoospermia): শুক্রাণুর আকার বা আকৃতি অস্বাভাবিক
হওয়া, যা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
(ঘ) বীর্যে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি (Azoospermia): বীর্যে একেবারেই কোনো শুক্রাণু না থাকা। এটি দুটি কারণে হতে পারে:
(১) Obstructive Azoospermia: শুক্রাণু তৈরি হলেও কোনো কারণে নালীতে বাধার কারণে বীর্যে মিশতে পারে না।
(২) Non-obstructive Azoospermia: অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন হয় না বা খুব কম হয়।
আপনার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং অভ্যাস শুক্রাণুর স্বাস্থ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
(ক) ধূমপান এবং মদ্যপান: ধূমপান শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা এবং আকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি
শুক্রাণুর ডিএনএ-তেও (DNA) ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত করে।
(খ) অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, যা টেস্টোস্টেরনকে
ইস্ট্রোজেনে (estrogen) রূপান্তর করে। এতে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শুক্রাণু উৎপাদন কমে যায়।
(গ) বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা: কীটনাশক, ভারী ধাতু (যেমন, সীসা), শিল্প রাসায়নিক (যেমন,
বেনজিন) বা বিকিরণের (radiation) সংস্পর্শে এলে শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
(ঘ) অতিরিক্ত মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটায়, যা টেস্টোস্টেরন
এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
(ঙ) অতিরিক্ত তাপ: অণ্ডকোষের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হয়। টাইট
আন্ডারওয়্যার, গরম পানিতে গোসল বা দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কাজ করা এর কারণ হতে পারে।
কিছু চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে।
(ক) কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপি: ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত এই পদ্ধতিগুলো শুক্রাণু উৎপাদনকারী
কোষগুলোকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে।
(খ) কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ:
অ্যান্টি-অ্যান্ড্রোজেন (Anti-androgens): প্রোস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েড (Anabolic Steroids): পেশি বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
কিছু উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ (Alpha-blockers): এগুলো রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন ঘটাতে পারে।
কিছু আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ।
অণ্ডকোষে অস্ত্রোপচার: হার্নিয়া, ভ্যাসেকটমি বা অণ্ডকোষ সংক্রান্ত যেকোনো সার্জারি প্রজননতন্ত্রের নালীগুলোকে
ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যদি আপনি এবং আপনার সঙ্গী এক বছর ধরে নিয়মিত, অসুরক্ষিত যৌন মিলনের পরেও গর্ভধারণে ব্যর্থ হন,
তাহলে এটি কোনো শারীরিক বা কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুবই জরুরি, কারণ:
(ক) নসময়মতো রোগ নির্ণয়: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (যেমন, বীর্য বিশ্লেষণ, হরমোন পরীক্ষা)
করে বন্ধ্যাত্বের আসল কারণ দ্রুত নির্ণয় করতে পারেন।
(খ) কার্যকর চিকিৎসা: কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়। ভেরিকোসিলের মতো সমস্যা অস্ত্রোপচারের
মাধ্যমে, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ওষুধের মাধ্যমে, এবং ব্লকেজ সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব।
(গ) সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি (ART): যদি বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সম্ভব না হয়, তাহলে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF)
বা ইন্ট্রা-সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (ICSI)-এর মতো আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমেও সন্তান ধারণ করা সম্ভব। এই পদ্ধতিগুলো কার্যকর
হতে পারে, যদি শুক্রাণুর সংখ্যা খুব কম হয় বা শুক্রাণু চলাচল করতে না পারে।
(ঘ) মানসিক সহায়তা: বন্ধ্যাত্ব একটি দম্পতির জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
বা কাউন্সেলর এই বিষয়ে মানসিক সহায়তা দিতে পারেন। মনে রাখবেন, পুরুষ বন্ধ্যাত্ব কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য
স্বাস্থ্যগত সমস্যা। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক ক্ষেত্রেই সমাধান পাওয়া সম্ভব।