পুরুষত্বহীনতা একটি জটিল সমস্যা এবং এর কারণগুলো শারীরিক ও মানসিক উভয়ই হতে পারে। প্রায়শই এটি একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল হয়। ইরেকটাইল ডিসফাংশন রোগের প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
শারীরিক কারণগুলোর (যৌন রোগ)- একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে, বিশেষ করে বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে। লিঙ্গে রক্ত প্রবাহে বাধা, স্নায়ুর ক্ষতি বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এর মূল কারণ।
(ক) এথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis): ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া
এবং সরু হয়ে যাওয়া। এটি লিঙ্গে রক্ত প্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা ইরেকশনের জন্য অপরিহার্য। এটি ইডি-র সবচেয়ে সাধারণ
শারীরিক কারণগুলির মধ্যে একটি।
(খ) উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure/Hypertension): এটি রক্তনালীগুলির ভেতরের আস্তরণের
ক্ষতি করে এবং রক্ত প্রবাহকে প্রভাবিত করে।
(গ) উচ্চ কোলেস্টেরল (High Cholesterol): ধমনীতে প্লেক জমা করতে সাহায্য করে, যা রক্তনালীগুলিকে
সংকীর্ণ করে তোলে।
(ঘ) ডায়াবেটিস (Diabetes): উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ু (নিউরোপ্যাথি) এবং রক্তনালী
(ভাস্কুলোপ্যাথি) উভয়েরই ক্ষতি করতে পারে। এটি লিঙ্গে রক্ত প্রবাহ এবং স্নায়ু সংকেত উভয়কেই ব্যাহত করে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত
পুরুষদের ইডি হওয়ার সম্ভাবনা ২-৩ গুণ বেশি।
(ক) টেস্টোস্টেরনের অভাব (Low Testosterone/Hypogonadism): টেস্টোস্টেরন
পুরুষদের যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাব ইডি এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাসের কারণ হতে পারে।
(খ) থাইরয়েড সমস্যা: হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম উভয়ই যৌন সমস্যা ঘটাতে পারে।
(গ) পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা: যা হরমোন উৎপাদনে প্রভাব ফেলে।
(ক) মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (Multiple Sclerosis - MS): মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের
স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
(খ) পারকিনসন্স রোগ (Parkinson's Disease): মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষের ক্ষতি করে।
(গ) স্ট্রোক (Stroke): মস্তিষ্কের যে অংশ যৌন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে তার ক্ষতি করতে পারে।
(ঘ) মেরুদণ্ডের আঘাত (Spinal Cord Injury): লিঙ্গে স্নায়ু সংকেত প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে।
(ঙ) পেলভিক সার্জারি (Pelvic Surgery): যেমন প্রোস্টেট সার্জারি (প্রোস্টেটেক্টমি) বা কোলন ক্যান্সার সার্জারির
সময় লিঙ্গের আশেপাশে স্নায়ু বা রক্তনালীর ক্ষতি হতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট ঔষধ ইডি ঘটাতে পারে বা এটিকে আরও খারাপ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
(ক) উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ (যেমন বিটা-ব্লকার, থিয়াজাইড ডাইউরেটিকস)।
(খ) অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (বিশেষ করে SSRIs)।
(গ) অ্যান্টিকোলিনার্জিকস।
(ঘ) অ্যান্ট হিস্টামিন।
(ঙ) প্রশমক ঔষধ (Sedatives)।
(চ) আলসার ঔষধ।
(ছ) ক্যান্সারের জন্য কেমোথেরাপি বা হরমোন থেরাপি।
(ক) ধূমপান: রক্তনালীগুলিকে সংকুচিত করে এবং রক্ত প্রবাহ কমায়।
(খ) অতিরিক্ত মদ্যপান: স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে এবং লিঙ্গ উত্থানকে বাধা দিতে পারে।
(গ) মাদকদ্রব্য সেবন: যেমন কোকেন, মারিজুয়ানা ইত্যাদি।
(ঘ) স্থূলতা (Obesity): ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বাড়ায়।
(ঙ) শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: ব্যায়ামের অভাব সামগ্রিক রক্ত সঞ্চালনকে প্রভাবিত করে।
(চ) কিডনি রোগ (Kidney Disease): দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং হরমোনের উপর প্রভাব
ফেলে ইডি ঘটাতে পারে।
(ছ) পেরোনির রোগ (Peyronie's Disease): লিঙ্গের টিস্যুতে দাগ বা তন্তু তৈরি হওয়া, যা লিঙ্গকে বাঁকা বা
বিকৃত করে এবং যৌন মিলনে ব্যথা বা ইডি সৃষ্টি করতে পারে।
মানসিক কারণগুলি প্রায়শই ইডি-র কারণ হয়, বিশেষ করে তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে। শারীরিক কারণ না
থাকলেও মানসিক চাপের কারণে ইডি হতে পারে।
(ক) মানসিক চাপ (Stress): কর্মক্ষেত্রে, আর্থিক বা ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চ মাত্রার চাপ ইডি ঘটাতে পারে।
(ক) কর্মক্ষমতা উদ্বেগ (Performance Anxiety): যৌন মিলনের সময় ভালো পারফর্ম
করতে না পারার ভয় ইডি-র একটি সাধারণ কারণ। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করতে পারে – উদ্বেগ ইডি ঘটায়, এবং ইডি আরও উদ্বেগ তৈরি করে।
(খ) সাধারণ উদ্বেগ বা প্যানিক ডিসঅর্ডারও ইডি ঘটাতে পারে।
(গ) হতাশা (Depression): হতাশা মস্তিষ্কের রাসায়নিক পদার্থকে প্রভাবিত করে যা যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং ইরেকশনকে
নিয়ন্ত্রণ করে। হতাশার জন্য ব্যবহৃত কিছু ঔষধও ইডি-র কারণ হতে পারে।
সঙ্গীর সাথে যোগাযোগে সমস্যা, ঝগড়া, অবিশ্বাসের অভাব বা অন্তরঙ্গতার অভাব যৌন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
(ক) আত্মবিশ্বাসের অভাব (Low Self-Esteem): নিজের শরীর বা যৌন ক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা।
(খ) অতীতের আঘাত (Past Trauma): অতীতের কোনো যৌন আঘাত বা খারাপ অভিজ্ঞতা যৌন কার্যকলাপের প্রতি নেতিবাচক
প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও বয়স বাড়লেই ইডি হবে এমন কোনো কথা নেই, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইডি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর কারণ হলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে রক্তনালী, স্নায়ু এবং হরমোনের পরিবর্তন হয়, এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগের মতো শারীরিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। যদি ইরেকটাইল ডিসফাংশনের (যৌন রোগ) লক্ষণ থাকে, তাহলে সঠিক কারণ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (যেমন ইউরোলজিস্ট বা অ্যান্ড্রোলজিস্ট) পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং কিছু ঔষধের মাধ্যমে এই সমস্যার সফল চিকিৎসা সম্ভব।