যক্ষ্মা (Tuberculosis বা TB) রোগের প্রকারভেদ বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে, তবে প্রধানত সংক্রমণ এবং আক্রান্ত স্থানের ওপর নির্ভর করে প্রকারভেদ করা হয়।
১. সুপ্ত যক্ষ্মা (Latent TB Infection - LTBI)-
(ক) এই ক্ষেত্রে, যক্ষ্মার জীবাণু (Mycobacterium tuberculosis)
শরীরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে।
(খ) আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো লক্ষণ থাকে না এবং তিনি অন্য কাউকে রোগ ছড়াতে পারেন না।
(গ) তবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে এই সুপ্ত সংক্রমণ ভবিষ্যতে সক্রিয় যক্ষ্মায় রূপান্তরিত হতে পারে।
(ঘ) সুপ্ত যক্ষ্মা শনাক্ত হলে অনেক সময় প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা (প্রিভেন্টিভ থেরাপি) দেওয়া হয় যাতে সক্রিয় যক্ষ্মা না হয়।
(ক) এই ক্ষেত্রে, যক্ষ্মার জীবাণু সক্রিয়ভাবে বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টি করে।
(খ) আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, জ্বর, ওজন হ্রাস, রাতে ঘাম হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।
(গ) ফুসফুসের সক্রিয় যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য কাউকে রোগ ছড়াতে পারেন (সংক্রামক)।
(ঘ) সক্রিয় যক্ষ্মার জন্য পুর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রয়োজন।
যক্ষ্মা শরীরের যেকোনো অঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে। এর ওপর ভিত্তি করে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
(ক) এটি যক্ষ্মার সবচেয়ে সাধারণ এবং সংক্রামক রূপ।
(খ) এই ক্ষেত্রে যক্ষ্মার জীবাণু মূলত ফুসফুসকে আক্রমণ করে।
(গ) লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী কাশি (দুই সপ্তাহের বেশি), কফ বা থুতুর সাথে রক্ত,
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর, রাতে ঘাম, ওজন হ্রাস এবং ক্ষুধামন্দা।
(ঘ) শ্বাস-প্রশ্বাস, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এটি অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।
যখন যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুস ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অঙ্গকে আক্রান্ত করে,
তখন তাকে এক্সট্রাপালমোনারি যক্ষ্মা বলে।
এটি সাধারণত সরাসরি ছোঁয়াচে হয় না (যদি না এর সাথে ফুসফুসের যক্ষ্মা না থাকে)।
এক্সট্রাপালমোনারি যক্ষ্মা বিভিন্ন রূপে দেখা দিতে পারে, যেমন-
(ক) লসিকাগন্থির যক্ষ্মা (TB Lymphadenitis): এটি সবচেয়ে সাধারণ এক্সট্রাপালমোনারি যক্ষ্মা,
যেখানে ঘাড়, বগল বা কুঁচকির লসিকাগন্থি ফুলে যায়।
(খ) অস্থি ও অস্থিসন্ধির যক্ষ্মা (Skeletal TB/Bone and Joint TB): মেরুদণ্ড (Pott's disease),
নিতম্ব, হাঁটু বা অন্যান্য জয়েন্টে হতে পারে, যা ব্যথা, ফোলা বা বিকৃতি সৃষ্টি করতে পারে।
(গ) মেনিনজিয়াল যক্ষ্মা (TB Meningitis): মস্তিষ্ক বা সুষুম্নাকাণ্ডের আবরণ (মেনিনজেস) আক্রান্ত
হয়, যা তীব্র মাথাব্যথা, জ্বর, ঘাড় শক্ত হওয়া এবং মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটি শিশুদের মধ্যে গুরুতর হতে পারে।
(ঘ) জেনিটোরিনারি যক্ষ্মা (Genitourinary TB): কিডনি, মূত্রনালী, মূত্রাশয় বা প্রজনন অঙ্গকে
আক্রান্ত করতে পারে, যার ফলে প্রস্রাবে সমস্যা, রক্তপাত বা ব্যথা হতে পারে।
(ঙ) গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল যক্ষ্মা (Gastrointestinal TB): অন্ত্র, পাকস্থলী বা পেটের অন্যান্য
অঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে, যার লক্ষণ হতে পারে পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য।
(চ) ত্বকের যক্ষ্মা (Cutaneous TB): ত্বকে ক্ষত বা ফোঁড়া দেখা যেতে পারে।
(ছ) চোখের যক্ষ্মা (Ocular TB): চোখের বিভিন্ন অংশকে আক্রান্ত করতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে।
(জ) পেরিকার্ডিয়াল যক্ষ্মা (TB Pericarditis): হৃৎপিণ্ডের বাইরের আবরণ (পেরিকার্ডিয়াম) আক্রান্ত হয়।
(ঝ) মিলিয়ারি যক্ষ্মা (Miliary TB): এটি একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক রূপ, যেখানে জীবাণু
রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক অঙ্গে ছোট ছোট ক্ষত সৃষ্টি করে। সাধারণত ফুসফুসে মিলির
বীজের মতো অসংখ্য ছোট ছোট স্পট দেখা যায় এক্স-রেতে।
কিছু ক্ষেত্রে, যক্ষ্মার প্রাথমিক সংক্রমণের পর বা দীর্ঘদিনের সুপ্ত অবস্থা থেকে রোগটি
পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।
(ক) প্রাথমিক যক্ষ্মা (Primary TB): প্রথমবার যখন জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণ
ঘটায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি উপসর্গহীন থাকে বা হালকা ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা যায়।
(খ) পুনরায় সক্রিয় যক্ষ্মা (Reactivation TB/Post-primary TB): সুপ্ত যক্ষ্মা থেকে রোগটি
পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে ঘটে। যক্ষ্মা রোগের প্রকারভেদ বুঝতে পারা
চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি প্রকারের জন্য নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় পদ্ধতি এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন।