+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism)

হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism) হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের চেয়ে কম পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন (প্রধানত থাইরক্সিন - T4 এবং ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন - T3) তৈরি করে। এই হরমোনগুলোর ঘাটতির কারণে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, যার ফলে বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়। একে কখনও কখনও "আন্ডারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড" বা "লেজি থাইরয়েড" বলা হয়।


হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণ:

হাইপোথাইরয়েডিজমের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো-
(১) হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস (Hashimoto's Thyroiditis): এটি হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং এটি একটি অটোইমিউন রোগ। এক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) ভুলবশত থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে এবং ধীরে ধীরে এটিকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে থাইরয়েড হরমোন তৈরির ক্ষমতা কমে যায়।
(২) আয়োডিনের ঘাটতি (Iodine Deficiency): থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। বিশ্বব্যাপী আয়োডিনের গুরুতর অভাব হাইপোথাইরয়েডিজমের একটি প্রধান কারণ, বিশেষ করে যেখানে আয়োডিনযুক্ত লবণ সহজলভ্য নয়।
(৩) থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণ (Thyroidectomy): থাইরয়েড ক্যান্সার, গুরুতর হাইপারথাইরয়েডিজম বা বড় গলগণ্ডের চিকিৎসার জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে থাইরয়েড গ্রন্থির অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করা হলে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়।
(৪) রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন থেরাপি (Radioactive Iodine Therapy - RAI): হাইপারথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করা হলে এটি থাইরয়েড কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়।
(৫) কিছু ঔষধ: কিছু ঔষধ, যেমন লিথিয়াম (বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত) বা অ্যামিওডারোন (হৃৎপিণ্ডের সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত), থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
(৬) জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম (Congenital Hypothyroidism): কিছু শিশু জন্ম থেকেই থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি হয়নি বা সঠিকভাবে কাজ করে না।
(৭) পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা (Pituitary Gland Disorders): খুব বিরল ক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি পর্যাপ্ত থাইরয়েড-স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) তৈরি করতে না পারলে থাইরয়েড গ্রন্থি উদ্দীপিত হয় না এবং হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।
(৮) প্রসবোত্তর থাইরয়েডাইটিস (Postpartum Thyroiditis): কিছু মহিলার ক্ষেত্রে প্রসবের পর থাইরয়েড গ্রন্থিতে প্রদাহ হয়, যা প্রথমে সাময়িকভাবে হাইপারথাইরয়েডিজম ঘটাতে পারে এবং পরে হাইপোথাইরয়েডিজমে পরিণত হতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ ও উপসর্গ:

যেহেতু থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, এর ঘাটতি হলে শরীরের কার্যক্ষমতা কমে যায়। লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়শই অস্পষ্ট থাকে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-
(১) ক্লান্তি ও অবসাদ: সব সময় ক্লান্ত লাগা এবং শক্তি কমে যাওয়া।
(২) ওজন বৃদ্ধি: স্বাভাবিক খাওয়া সত্ত্বেও বা খুব কম খেলেও ওজন বেড়ে যাওয়া।
(৩) ঠাণ্ডা অসহিষ্ণুতা: ঠান্ডা বেশি লাগা বা ঠান্ডা পরিবেশে অস্বস্তি বোধ করা, এমনকি গরম কাপড় পরা সত্ত্বেও।
(৪) কোষ্ঠকাঠিন্য: হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা।
(৫) শুষ্ক ত্বক ও চুল: ত্বক শুষ্ক, খসখসে এবং চুল রুক্ষ ও পাতলা হয়ে যাওয়া, চুল পড়া।
(৬) পেশী ও জয়েন্টে ব্যথা: পেশী ও জয়েন্টে ব্যথা এবং শক্ত হয়ে যাওয়া।
(৭) বিষণ্নতা ও মেজাজের পরিবর্তন: মনমরা ভাব, মনোযোগের অভাব, ভুলে যাওয়া, বিরক্তি।
(৮) অনিয়মিত বা অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাত (মহিলাদের ক্ষেত্রে)।
(৯) ধীর হৃদস্পন্দন (Bradycardia)।
(১০) ফোলাভাব: বিশেষ করে মুখ, হাত ও পায়ে ফোলাভাব (মিক্সিডিমা)।
(১১) কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন: গলা বসে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর ভারী হওয়া।
(১২) কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি।

গুরুতর হাইপোথাইরয়েডিজম (Myxedema Coma)::

বিরল এবং গুরুতর হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে মিক্সিডিমা কোমা নামক একটি জীবন-হুমকির অবস্থা হতে পারে, যেখানে শরীরের তাপমাত্রা dangerously কমে যায়, জ্ঞান হারানো বা কোমা হতে পারে। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।

রোগ নির্ণয়:

হাইপোথাইরয়েডিজম নির্ণয় করা হয় রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে-
(১) TSH (Thyroid Stimulating Hormone): হাইপোথাইরয়েডিজমে TSH-এর মাত্রা সাধারণত বেশি থাকে (কারণ মস্তিষ্ক থাইরয়েডকে বেশি করে হরমোন তৈরির জন্য উদ্দীপিত করার চেষ্টা করে)।
(২) Free T4 (Thyroxine): এই হরমোনের মাত্রা সাধারণত কম থাকে।
(৩) কিছু ক্ষেত্রে, থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা (যেমন অ্যান্টি-TPO অ্যান্টিবডি) করা হয় হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস নির্ণয়ের জন্য।

চিকিৎসা:

হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা অত্যন্ত সহজ এবং কার্যকর। এটি সাধারণত লেভোথাইরক্সিন (Levothyroxine) নামক একটি সিন্থেটিক থাইরয়েড হরমোন দিয়ে করা হয়।
(১) এটি একটি মৌখিক ঔষধ যা প্রতিদিন সকালে খালি পেটে নিতে হয়।
(২) এই ঔষধটি হারিয়ে যাওয়া থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন করে এবং শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার করে।
(৩) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, রোগীদের আজীবন এই ঔষধ নিতে হয়।
(৪) চিকিৎসক নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে (বিশেষ করে TSH মাত্রা) ঔষধের ডোজ সমন্বয় করেন। সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত ফলো-আপের মাধ্যমে হাইপোথাইরয়েডিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরা একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।