+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

থাইরয়েড রোগের ইতিহাস

থাইরয়েড গ্রন্থি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত রোগগুলোর ইতিহাস মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই গ্রন্থি এবং এর অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সচেতন ছিল, যদিও তখন এর সঠিক কার্যকারিতা বা রোগের কারণ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।


প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ; প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ:

(১) প্রাচীন সভ্যতা: থাইরয়েড গ্রন্থির ফোলা (গলগণ্ড বা Glandular Swelling) প্রাচীন মিশর, চীন এবং গ্রীসে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
(২) চীন (২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): প্রাচীন চীনা চিকিৎসকরা গলগণ্ডের চিকিৎসার জন্য সামুদ্রিক শৈবাল এবং পোড়া স্পঞ্জ ব্যবহার করতেন। তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে এই সামুদ্রিক পণ্যগুলো গলগণ্ড কমাতে সাহায্য করে, যদিও তারা জানত না যে এর কারণ ছিল আয়োডিন।
(৩) প্রাচীন গ্রীস ও রোম: হিপোক্রেটিস, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে, গলগণ্ড এবং অন্যান্য গ্রন্থি ফোলা সম্পর্কে লিখেছেন। রোমান লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার (প্রথম শতক খ্রিস্টাব্দ) তার লেখায় গলগণ্ডের চিকিৎসার জন্য সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
(৪) মধ্যযুগ: আরব চিকিৎসকরাও গলগণ্ডের চিকিৎসা সম্পর্কে লিখেছেন। সুপ্রাচীন ইসলামী চিকিৎসা গ্রন্থ, যেমন ইবনে সিনা'র 'ক্যানন অফ মেডিসিন'-এ গলগণ্ড এবং এর চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

রেনেসাঁ এবং থাইরয়েডের আবিষ্কার:

(১) ১৫০০-এর দশক: লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) থাইরয়েড গ্রন্থির প্রথম সঠিক চিত্র এঁকেছিলেন এবং এটিকে "গলার গ্ল্যান্ডস" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
(২) ১৫৪৩ সাল: আন্দ্রেয়াস ভেসালিয়াস, আধুনিক শারীরস্থানের জনক, তার প্রভাবশালী বই De Humani Corporis Fabrica-তে থাইরয়েড গ্রন্থিকে স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করেন। তবে, তিনি এর সঠিক কাজ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না।
(৩) ১৬৫৬ সাল: ইংরেজ শারীরতত্ত্ববিদ থমাস ওয়ার্টন আনুষ্ঠানিকভাবে এই গ্রন্থির নামকরণ করেন "থাইরয়েড"। গ্রিক শব্দ 'thyreos' থেকে এই নামটি এসেছে, যার অর্থ 'ঢাল' (shield)। তিনি এই গ্রন্থির কাঠামোগত বর্ণনা দেন, কিন্তু এর কাজ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি।
(৪) ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দী: থাইরয়েডের কার্যকারিতা উন্মোচন এই সময়কালে থাইরয়েডের রোগগুলো আরও ভালোভাবে চিহ্নিত হতে শুরু করে।
(৫) ১৭০০-এর দশক: গলগণ্ডকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়।
(৬) ১৮২৫ সাল: ডমিনিক জ্যাঁ লারে, নেপোলিয়নের সার্জন, গলগণ্ডকে শৈশবকালে পুষ্টির অভাবের সাথে যুক্ত করেন।
(৭) ১৮২০-এর দশক: জিন-ফ্রাঁসোয়া কয়েল এবং তার সমসাময়িকরা গলগণ্ডের সফল অস্ত্রোপচার শুরু করেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরে কিছু রোগীর মধ্যে নতুন কিছু উপসর্গ দেখা যায়, যা পরবর্তীতে হাইপোথাইরয়েডিজম নামে পরিচিত হয়।
(৮) ১৮৫০-এর দশক: রবার্ট গ্রেভস এবং কার্ল ভন বাসডাউ স্বাধীনভাবে হাইপারথাইরয়েডিজম-এর লক্ষণগুলো (যেমন গলগণ্ড, চোখ বেরিয়ে আসা এবং দ্রুত হৃদস্পন্দন) বর্ণনা করেন, যা এখন গ্রেভস রোগ নামে পরিচিত।
(৯) ১৮৮০-এর দশক:
(ক) সুইস সার্জন থিওডর কচার গলগণ্ডের অস্ত্রোপচারে তার যুগান্তকারী কাজের জন্য ১৯০৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি লক্ষ্য করেন যে, যখন তিনি সম্পূর্ণ থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণ করেন, তখন রোগীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক অবনতি দেখা যায়, যা মাইক্সোডিমা (প্রাপ্তবয়স্কদের হাইপোথাইরয়েডিজমের তীব্র রূপ) নামে পরিচিত।
(খ) এরপর স্যার উইলিয়াম গোল্ড এবং ডব্লিউ.এম. অর্ড মাইক্সোডিমাকে থাইরয়েড গ্রন্থির অকার্যকারিতার সাথে যুক্ত করেন।
(১০) ১৮৯৬ সাল: ইউজিন বাউম্যান নামে একজন জার্মান রসায়নবিদ থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে আয়োডিন আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার থাইরয়েড হরমোনের কাজ বুঝতে এবং আয়োডিনের ঘাটতিজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।
(১১) ২০শ শতাব্দী: হরমোন আবিষ্কার এবং আধুনিক চিকিৎসা, বিংশ শতাব্দীতে থাইরয়েড রোগের কারণ, নির্ণয় এবং চিকিৎসায় বিপ্লব আসে।
(১২) ১৯০০-এর দশকের প্রথম দিকে: থাইরয়েড হরমোন, থাইরক্সিন (T4), প্রথমবার থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ১৯২৭ সালে এর রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা হয়।
(১৩) ১৯৩০-এর দশক: থাইরয়েড রোগের জন্য কার্যকর অ্যান্টিথাইরয়েড ড্রাগ (যেমন থায়োরেটিস) আবিষ্কার করা হয়, যা সার্জারি ছাড়াই হাইপারথাইরয়েডিজম নিরাময়ে সহায়তা করে।
(১৪) ১৯৪০-এর দশক: রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন (I-131) থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসায় এবং হাইপারথাইরয়েডিজম নির্ণয়ে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এটি থাইরয়েডের অতিরিক্ত কার্যকারিতা ধ্বংস করতে সক্ষম।
(১৫) ১৯৫০-এর দশক: থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) এবং থাইরয়েড-রিলিজিং হরমোন (TRH) এর আবিষ্কার থাইরয়েডের কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গভীরতর জ্ঞান প্রদান করে।
(১৬) ১৯৭০-এর দশক: থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা পরিমাপের জন্য রেডিওইমিউনোঅ্যাসে (RIA) পদ্ধতি উন্নত করা হয়, যা থাইরয়েড রোগ নির্ণয়কে আরও নির্ভুল ও সহজ করে তোলে।
(১৭) ১৯৮০-এর দশক থেকে বর্তমান: অটোইমিউন থাইরয়েড রোগ (যেমন হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস এবং গ্রেভস রোগ) সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড, বায়োপসি এবং উন্নত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড রোগ নির্ণয় এখন অত্যন্ত নির্ভুল। সিন্থেটিক থাইরয়েড হরমোন (লেভোথাইরক্সিন) হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য একটি নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার লাভ করে। থাইরয়েড রোগের ইতিহাস প্রমাণ করে যে মানবজাতির জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে কীভাবে একটি রহস্যময় গ্রন্থির জটিলতাগুলো উন্মোচিত হয়েছে এবং কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি বিকশিত হয়েছে।