থাইরয়েডাইটিস (Thyroiditis) হলো থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহ। "ইটিস" (itis) উপসর্গটি সাধারণত কোনো অঙ্গের প্রদাহ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (যেমন, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস)। থাইরয়েডাইটিসের ক্ষেত্রে, থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা এর হরমোন উৎপাদন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রদাহের কারণে থাইরয়েড হরমোন রক্তে দ্রুত নিঃসৃত হতে পারে, যা প্রাথমিকভাবে হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism) বা অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন ঘটাতে পারে। এরপর যখন থাইরয়েডের মজুত হরমোন ফুরিয়ে যায় এবং গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এটি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না, যার ফলে হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism) বা কম থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, থাইরয়েড ফাংশন আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।
থাইরয়েডাইটিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যার মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
(ক) অটোইমিউন রোগ (Autoimmune Disorders):
এটি থাইরয়েডাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত
থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে।
(খ) সংক্রমণ (Infections): ভাইরাস (যেমন ফ্লু, মাম্পস) বা ব্যাকটেরিয়া
(বিরল ক্ষেত্রে) থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রান্ত করতে পারে।
(গ) কিছু ঔষধ: নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ, যেমন অ্যামিওডারোন (amiodarone),
লিথিয়াম (lithium), বা ইন্টারফেরন (interferon), থাইরয়েড গ্রন্থিতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
(ঘ) বিকিরণ (Radiation): ঘাড় বা মাথার ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিকিরণ
থেরাপি থাইরয়েডকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
(ঙ) আঘাত বা ট্রমা: গলায় আঘাত লাগলে থাইরয়েডাইটিস হতে পারে।
থাইরয়েডাইটিসকে এর কারণ, প্রদাহের ধরণ এবং ব্যথার উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়:
(ক) কারণ: এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরনের থাইরয়েডাইটিস এবং
এটি একটি অটোইমিউন রোগ। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়।
(খ) বৈশিষ্ট্য: এটি সাধারণত ব্যথাহীন হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক)। এটি সময়ের সাথে সাথে
হাইপোথাইরয়েডিজমের (কম থাইরয়েড হরমোন) দিকে পরিচালিত করে। গলগণ্ড (থাইরয়েড গ্রন্থির ফোলা) হতে পারে।
(ক) কারণ: সাধারণত একটি ভাইরাল সংক্রমণের
(যেমন ফ্লু বা মাম্পসের পরে) ফলস্বরূপ ঘটে।
(খ) বৈশিষ্ট্য: এটি ব্যথাযুক্ত থাইরয়েডাইটিস। গলা, চোয়াল বা কানে ব্যথা হতে পারে।
সাধারণত প্রথমে কয়েক সপ্তাহ ধরে হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত হয়), তারপর হাইপোথাইরয়েডিজম
এবং অবশেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড ফাংশন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
(ক) কারণ: এটি এক ধরনের অটোইমিউন থাইরয়েডাইটিস যা সন্তান
প্রসবের পর (সাধারণত এক বছরের মধ্যে) মহিলাদের মধ্যে দেখা যায়
(খ) বৈশিষ্ট্য: এটিও প্রায়শই ব্যথাহীন হয়। সাধারণত প্রথমে সাময়িক হাইপারথাইরয়েডিজম
এবং তারপর হাইপোথাইরয়েডিজম হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, থাইরয়েড ফাংশন এক বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়,
তবে কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।
((ক) কারণ: এর কারণ সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবে এটিও এক
ধরনের অটোইমিউন প্রক্রিয়া বলে মনে করা হয়। এটি প্রসবোত্তর থাইরয়েডাইটিসের মতো কিন্তু গর্ভবতী নন এমন
পুরুষ বা মহিলাদের ক্ষেত্রে ঘটে।
ক) বৈশিষ্ট্য: নাম থেকেই বোঝা যায় এটি ব্যথাহীন। এটিরও সাবঅ্যাকিউট থাইরয়েডাইটিসের
মতো হাইপারথাইরয়েডিজম থেকে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং শেষে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রবণতা থাকে।
(ক) কারণ: এটি থাইরয়েড গ্রন্থির ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (খুব বিরল)।
(খ) বৈশিষ্ট্য: তীব্র ঘাড়ে ব্যথা, জ্বর, ঠান্ডা লাগা এবং গ্রন্থি ফোলা এর প্রধান লক্ষণ।
এটি একটি গুরুতর অবস্থা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
(ক) কারণ: কিছু নির্দিষ্ট ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটে (যেমন অ্যামিওডারোন, লিথিয়াম, ইন্টারফেরন)।
(খ) বৈশিষ্ট্য: ঔষধের উপর নির্ভর করে হাইপারথাইরয়েডিজম বা হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।
ঔষধ বন্ধ করলে প্রায়শই অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
(ক) কারণ: এটি একটি অত্যন্ত বিরল অবস্থা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি ধীরে ধীরে শক্ত
তন্তুযুক্ত টিস্যু (fibrous tissue) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এর কারণ সম্পূর্ণ অজানা, তবে এটি একটি অটোইমিউন রোগ হতে পারে।
(খ) শিষ্ট্য: থাইরয়েড গ্রন্থি খুব শক্ত হয়ে যায় এবং আশেপাশের কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে
শ্বাস নিতে বা গিলতে অসুবিধা হতে পারে। এটি প্রায়শই স্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজমের দিকে পরিচালিত করে।
থাইরয়েডাইটিসের লক্ষণগুলো নির্ভর করে এর প্রকার এবং থাইরয়েড হরমোনের মাত্রার উপর।
(ক) প্রাথমিক হাইপারথাইরয়েড পর্যায় (যদি থাকে): দ্রুত হৃদস্পন্দন, উদ্বেগ, ওজন
হ্রাস, তাপ অসহিষ্ণুতা, ঘাম, মেজাজ পরিবর্তন।
(খ) পরবর্তী হাইপোথাইরয়েড পর্যায় (যদি থাকে): ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, ঠান্ডা অসহিষ্ণুতা, কোষ্ঠকাঠিন্য,
শুষ্ক ত্বক ও চুল, বিষণ্নতা।
(গ) ব্যথা: কিছু প্রকার থাইরয়েডাইটিসে (যেমন সাবঅ্যাকিউট বা অ্যাকিউট) ঘাড়ে ব্যথা, স্পর্শকাতরতা,
জ্বর, পেশী ব্যথা হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা (TSH, T3, T4, থাইরয়েড অ্যান্টিবডি), ইমেজিং (আল্ট্রাসাউন্ড) এবং ক্ষেত্রবিশেষে বায়োপসি করা হতে পারে। চিকিৎসা থাইরয়েডাইটিসের প্রকার এবং এর ফলে সৃষ্ট থাইরয়েড হরমোনের মাত্রার উপর নির্ভর করে। এটি প্রদাহ কমাতে NSAIDs বা কর্টিকোস্টেরয়েড, অতিরিক্ত হরমোন নিয়ন্ত্রণ করতে বিটা-ব্লকার, এবং হাইপোথাইরয়েডিজম হলে থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন (লেভোথাইরক্সিন) অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। অনেক ধরনের থাইরয়েডাইটিস সাময়িক হয় এবং চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায়, তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।