হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism) হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি (গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতি-আকৃতির গ্রন্থি) প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন (প্রধানত থাইরক্সিন - T4 এবং ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন - T3) উৎপাদন করে এবং রক্তে ছেড়ে দেয়। এই অতিরিক্ত হরমোন শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে (metabolism) দ্রুত করে দেয়, যার ফলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে এবং বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়। একে কখনও কখনও "ওভারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড" বা "থাইরোটক্সিকোসিস" (যখন কোনো কারণে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোনের কারণে লক্ষণ দেখা দেয়) বলা হয়।
হাইপারথাইরয়েডিজমের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো:
(১) গ্রেভস ডিজিজ (Graves' Disease):
এটি হাইপারথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং এটি একটি অটোইমিউন রোগ।
এক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত এমন কিছু অ্যান্টিবডি (যেমন TSI বা
TRAb) তৈরি করে যা থাইরয়েড গ্রন্থিকে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে উদ্দীপিত করে।
(২) থাইরয়েড নোডুলস (Thyroid Nodules): থাইরয়েড গ্রন্থির
মধ্যে এক বা একাধিক পিণ্ড বা "নোডুল" তৈরি হতে পারে, যা অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে পারে।
(ক) টক্সিক অ্যাডেনোমা (Toxic Adenoma): একটি একক নোডুল যা
অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে।
(খ) টক্সিক মাল্টিনোডুলার গয়টার (Toxic Multinodular Goiter):
একাধিক নোডুল যা অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে।
(৩) থাইরয়েডাইটিস (Thyroiditis): থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহ। এই
প্রদাহের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থিতে জমা থাকা হরমোন রক্তে দ্রুত নিঃসৃত হয়, ফলে সাময়িকভাবে
হাইপারথাইরয়েডিজম দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই প্রদাহ পরে হাইপোথাইরয়েডিজমে পরিণত হতে পারে।
(৪) অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণ: থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন
প্রয়োজন। কিছু ওষুধ (যেমন অ্যামিওডারোন) বা আয়োডিন-সমৃদ্ধ খাদ্য বা সাপ্লিমেন্ট অতিরিক্ত পরিমাণে
গ্রহণ করলে থাইরয়েড অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে পারে।
(৫) থাইরয়েড হরমোন ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার: হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসার
জন্য ব্যবহৃত থাইরয়েড হরমোন (লেভোথাইরক্সিন) যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করা হয়, তবে তা
হাইপারথাইরয়েডিজম ঘটাতে পারে।
(৬) পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার: খুব বিরল ক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থিতে একটি
সৌম্য টিউমার (নন-ক্যান্সারাস) তৈরি হতে পারে, যা অতিরিক্ত TSH (থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন) উৎপাদন
করে এবং থাইরয়েডকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে তোলে।
যেহেতু থাইরয়েড হরমোন শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজকে প্রভাবিত করে,
তাই হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলোও ব্যাপক হতে পারে। লক্ষণগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হতে পারে,
তবে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-
(১) ওজন হ্রাস: পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া সত্ত্বেও বা ক্ষুধা বৃদ্ধি সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া।
(২) দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Palpitations): বুক ধড়ফড় করা, হৃদস্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া (ট্যাকিকার্ডিয়া, অ্যারিথমিয়া)।
(৩) উদ্বেগ, নার্ভাসনেস ও খিটখিটে মেজাজ: অতিরিক্ত অস্থিরতা, মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন, বিরক্তি।
(৪) কম্পন (Tremors): বিশেষ করে হাত বা আঙুলে মৃদু কাঁপুনি।
(৫) অতিরিক্ত ঘাম ও তাপ অসহিষ্ণুতা: গরম আবহাওয়া বা ঘরেও বেশি ঘাম হওয়া এবং গরম সহ্য করতে না পারা।
(৬) ঘুমের সমস্যা: অনিদ্রা বা ঘুম কমে যাওয়া।
(৭) ক্লান্তি ও পেশী দুর্বলতা: সহজে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া এবং পেশী দুর্বলতা, বিশেষ করে উরু ও কাঁধের পেশীতে।
(৮) থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি (গলগণ্ড): গলার সামনের দিকে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যাওয়া।
(৯) ঘন ঘন মলত্যাগ বা ডায়রিয়া।
(১০) মাসিক চক্রের পরিবর্তন (মহিলাদের ক্ষেত্রে): মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা হালকা হওয়া।
(১১) চুল পড়া বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, ভঙ্গুর নখ।
(১২) ত্বকের সমস্যা: ত্বক উষ্ণ ও ভেজা লাগা।
যদি হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণ গ্রেভস ডিজিজ হয়, তাহলে কিছু অতিরিক্ত লক্ষণ দেখা দিতে পারে-
(১) চোখের সমস্যা (গ্রেভস অপথালমোপ্যাথি): চোখ ফুলে যাওয়া (এক্সপথ্যালমোস), চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে
আসা, চোখে জ্বালা, শুষ্কতা, লালভাব, আলোতে সংবেদনশীলতা, দ্বৈত দৃষ্টি।
(২) ত্বকের সমস্যা (গ্রেভস ডার্মোপ্যাথি): বিরল ক্ষেত্রে পায়ের নিচের অংশে লালচে, মোটা, দানাদার ত্বক
(কমলালেবুর খোসার মতো) দেখা দিতে পারে।
হাইপারথাইরয়েডিজম নির্ণয়ের জন্য সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে প্রধান হলো-
(১) TSH (Thyroid Stimulating Hormone): হাইপারথাইরয়েডিজমে TSH-এর মাত্রা সাধারণত খুব কম থাকে।
(২) Free T3 এবং Free T4 (Thyroid Hormones): এই হরমোনগুলোর মাত্রা বেশি থাকে।
(৩) থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা (TRAb/TSI): গ্রেভস ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য এই অ্যান্টিবডিগুলো
পরীক্ষা করা হয়। অন্যান্য পরীক্ষা যেমন রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন আপটেক টেস্ট (RAIU) বা থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড রোগের
কারণ নির্ণয়ে সাহায্য করে।
হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণ, রোগের তীব্রতা, রোগীর বয়স এবং অন্যান্য
স্বাস্থ্যগত অবস্থার উপর। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:
(১) অ্যান্টিথাইরয়েড ঔষধ (Antithyroid Medications):
(ক) যেমন: মেথিমাজোল (Methimazole) এবং প্রোপাইলথিওউরাসিল (Propylthiouracil - PTU)। (খ) এই ঔষধগুলো থাইরয়েড
গ্রন্থিকে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করা থেকে বিরত রাখে। এগুলি সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে নিতে হয়।
(২) রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন থেরাপি (Radioactive Iodine Therapy - RAI): (ক) এই চিকিৎসায় রোগীকে
তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের একটি ডোজ মৌখিকভাবে দেওয়া হয়। থাইরয়েড কোষগুলো এই আয়োডিন শোষণ করে এবং সময়ের সাথে সাথে
ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে হরমোন উৎপাদন কমে যায়। (খ) এই চিকিৎসার পর প্রায়শই রোগীদের হাইপোথাইরয়েডিজম হয় এবং তাদের
আজীবন থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন ঔষধ নিতে হয়।
(৩) অস্ত্রোপচার (Surgery - Thyroidectomy): (ক) কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, যেমন গর্ভবতী মহিলা, যাদের
ঔষধ বা রেডিওআয়োডিন থেরাপি কার্যকর হয় না, বা গলগণ্ড খুব বড় হয় যা শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা সৃষ্টি করে, তাদের থাইরয়েড গ্রন্থির
অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা যেতে পারে। (খ) অস্ত্রোপচারের পরও সাধারণত আজীবন থাইরয়েড
হরমোন প্রতিস্থাপন ঔষধ নিতে হয়।
(৪) বিটা-ব্লকার (Beta-Blockers): (ক) এই ঔষধগুলো থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমায় না, তবে
হাইপারথাইরয়েডিজমের কিছু লক্ষণ, যেমন দ্রুত হৃদস্পন্দন, কাঁপুনি, উদ্বেগ ইত্যাদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে। যেকোনো
থাইরয়েড সমস্যার জন্য একজন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট (হরমোন বিশেষজ্ঞ) এর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।