+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

টিউমার রোগ কী?

টিউমার (Tumor) হলো শরীরের কোষের অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট একটি পিণ্ড বা ভর (mass)। আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত নতুন কোষ তৈরি করে পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে প্রতিস্থাপন করে। এই প্রক্রিয়াটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু যখন এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে যায়, তখন কোষগুলো প্রয়োজন ছাড়াই বিভাজিত হতে থাকে এবং পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো মারা না গিয়ে জমা হতে থাকে। এই অতিরিক্ত কোষগুলো একত্রিত হয়ে একটি পিণ্ড তৈরি করে, যাকে টিউমার বলা হয়। টিউমারকে নিওপ্লাজম (Neoplasm) নামেও অভিহিত করা হয়। সব টিউমারই ক্যান্সার নয়। টিউমার দু'ধরনের হতে পারে:
১. বিনাইন টিউমার (Benign Tumor): এটি ক্যান্সার নয়।
২. ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant Tumor): এটি ক্যান্সার।


টিউমার রোগের ধরন কী কী?

টিউমারকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: বিনাইন (Benign) এবং ম্যালিগন্যান্ট (Malignant)। এছাড়াও, একটি মধ্যবর্তী পর্যায় আছে যা প্রিক্যান্সারাস (Precancerous) নামে পরিচিত।

১. বিনাইন টিউমার (Benign Tumors)

বৈশিষ্ট্য:
(ক) ক্যান্সারবিহীন: বিনাইন টিউমার ক্যান্সার নয় এবং সাধারণত জীবন-হুমকির কারণ হয় না।
(খ) সীমিত বৃদ্ধি: এই টিউমারগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। এরা আশেপাশের টিস্যুকে আক্রমণ করে না।
(গ) ছড়িয়ে পড়ে না: বিনাইন টিউমার শরীরের অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে পড়ে না (মেটাস্ট্যাসিস হয় না)।
(ঘ) পুনরাবৃত্তি কম: একবার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হলে সাধারণত এটি আবার ফিরে আসে না।
(ঙ) নিয়মিত আকৃতি: এদের প্রায়শই একটি সুনির্দিষ্ট এবং মসৃণ আকৃতি থাকে, যা একটি ক্যাপসুল দ্বারা আবৃত থাকতে পারে।

উদাহরণ:

(ক) লাইপোমা (Lipoma): ত্বকের নিচে চর্বি কোষের তৈরি নরম পিণ্ড।
(খ) ফাইব্রয়েড (Fibroids): জরায়ুতে (Uterus) সাধারণত দেখা যায় এমন বিনাইন টিউমার।
(গ) অ্যাডেনোমা (Adenoma): গ্রন্থি বা অঙ্গগুলোতে (যেমন থাইরয়েড, কলোন) তৈরি হওয়া টিউমার।
(ঘ) হেম্যানজিওমা (Hemangioma): রক্তনালীর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, যা জন্মদাগের মতো দেখায়।
চিকিৎসা: বেশিরভাগ বিনাইন টিউমার ক্ষতিকারক না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এগুলো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, মস্তিষ্কের বিনাইন টিউমার আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, অথবা শরীরের কোনো অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় বাধা দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।

২. ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant Tumors)
বৈশিষ্ট্য:

(ক) ক্যান্সারযুক্ত: ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হলো ক্যান্সার।
(খ) আক্রমণাত্মক বৃদ্ধি: এরা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আশেপাশের টিস্যু এবং অঙ্গগুলোতে আক্রমণ করতে (Invasion) সক্ষম।
(গ) ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা (মেটাস্ট্যাসিস): ম্যালিগন্যান্ট কোষগুলো মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রক্তনালী বা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সেখানে নতুন টিউমার (মেটাস্ট্যাসিস) তৈরি করতে পারে।
(ঘ) পুনরাবৃত্তি: অপসারণের পরও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ফিরে আসার (recurrence) সম্ভাবনা থাকে।
(ঙ) অনিয়মিত আকৃতি: এদের আকৃতি সাধারণত অনিয়মিত হয় এবং সীমানা অস্পষ্ট হতে পারে।

উদাহরণ:
ম্যালিগন্যান্ট টিউমারগুলো যে ধরনের কোষ থেকে তৈরি হয় তার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নামকরণ করা হয়:
(ক) কার্সিনোমা (Carcinoma): এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরনের ক্যান্সার, যা আবরণী কলা (epithelial cells) থেকে উৎপন্ন হয়। এই কোষগুলো ত্বক এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির পৃষ্ঠকে আবৃত করে। উদাহরণ: স্তন ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার।
(খ) সারকোমা (Sarcoma): এটি মেসেনকাইমাল কোষ থেকে উদ্ভূত হয়, যা হাড়, পেশী, চর্বি, রক্তনালী এবং অন্যান্য সংযোজক টিস্যুতে পাওয়া যায়। উদাহরণ: অস্টিওসারকোমা (হাড়ের ক্যান্সার), লাইপোসারকোমা (চর্বি টিস্যুর ক্যান্সার)।
(গ) লিউকেমিয়া (Leukemia): এটি রক্তের ক্যান্সার, যা অস্থি মজ্জার (bone marrow) শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) থেকে শুরু হয়। লিউকেমিয়া সাধারণত কোনো শক্ত টিউমার তৈরি করে না, বরং অস্বাভাবিক রক্তকণিকা রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে।
(ঘ) লিম্ফোমা (Lymphoma): এটি লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের ক্যান্সার, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ। এটি লিম্ফ নোড, প্লীহা এবং অন্যান্য লিম্ফ্যাটিক অঙ্গকে প্রভাবিত করে।
(ঙ) মাল্টিপল মাইয়েলোমা (Multiple Myeloma): এটি এক ধরনের ক্যান্সার যা প্লাজমা কোষকে প্রভাবিত করে, যা এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
(চ) সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের ক্যান্সার (Central Nervous System Cancers): মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের ক্যান্সার। উদাহরণ: গ্লিওমা, মেনিনজিওমা।
(ছ) জার্ম সেল টিউমার (Germ Cell Tumors): প্রজনন কোষ (শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরির কোষ) থেকে তৈরি হয়। (যেমন: ডিম্বাশয় বা শুক্রাশয়ের টিউমার)।
(জ) নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার (Neuroendocrine Tumors): স্নায়ু কোষ এবং হরমোন উৎপাদনকারী কোষের বৈশিষ্ট্য ধারণকারী কোষ থেকে তৈরি হয়।
চিকিৎসা:
ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের চিকিৎসার জন্য সাধারণত সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি এবং অন্যান্য উন্নত পদ্ধতির প্রয়োজন হয়।

সারসংক্ষেপ: বিনাইন বনাম ম্যালিগন্যান্ট টিউমার

বৈশিষ্ট্য বিনাইন টিউমার (Benign Tumor)
1-ক্যান্সার?: না, ক্যান্সার নয়
2-বৃদ্ধি: ধীরে ধীরে
3-আক্রমণ: শরীরের অন্য কোথাও ছড়ায় না (মেটাস্ট্যাসিস নেই)
4-ছড়িয়ে পড়া: সীমানা সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট সীমানা
5-সীমানা: সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট সীমানা
6-পুনরাবৃত্তি: সাধারণত ফিরে আসে না
7-জীবন-হুমকি: সাধারণত নয়, তবে আকার বা অবস্থানের কারণে সমস্যা করতে পারে
8-চিকিৎসা: সাধারণত অপসারণই যথেষ্ট, অনেক সময় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়
ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (Malignant Tumor)
1-হ্যাঁ, ক্যান্সার
2-দ্রুত
3-আশেপাশে আক্রমণ করে
4-শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়তে পারে (মেটাস্ট্যাসিস)
5-অনিয়মিত, অস্পষ্ট সীমানা
6-ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে
7-হতে পারে, বিশেষ করে মেটাস্ট্যাসিস হলে
8-সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ইত্যাদি

Export to Sheets

শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পিণ্ড বা পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেলে, দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় চিকিৎসার সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।