+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

টিউমার রোগের ইতিহাস

টিউমার, যা কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত, মানব ইতিহাসের আদিকাল থেকেই মানুষের স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ধারণা, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার পদ্ধতি হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত হয়েছে।


১. প্রাচীন সভ্যতায় টিউমারের প্রমাণ (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০০ - খ্রিস্টপূর্ব ৫০০)

(ক) প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন: প্রাচীন ডাইনোসরের ফসিল এবং নিয়ান্ডারথালদের প্রায় ৩০০০০ বছর পুরোনো দেহাবশেষে হাড়ের টিউমারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে যে টিউমার শুধু আধুনিক মানুষের রোগ নয়, বরং বহু প্রাচীন জীবদের মধ্যেও এর অস্তিত্ব ছিল।

(খ) মিশরীয় সভ্যতা (প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস হলো টিউমার রোগের প্রাচীনতম লিখিত দলিলগুলির মধ্যে একটি, যা মূলত ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি পুরোনো পাঠ্যের অনুলিপি। এই মিশরীয় চিকিৎসা পাঠ্যে আটটি স্তন টিউমারের বর্ণনা করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই টিউমারগুলোকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের চেষ্টা করা হলেও, পাঠ্যটিতে বলা হয়েছে যে "এই রোগের কোনো প্রতিকার নেই।" এটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রাচীন মিশরীয়রা টিউমারের কিছু সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এছাড়া, প্রাচীন মিশরীয় মমিতে হাড়ের টিউমারের প্রমাণও মিলেছে।

(গ) প্রাচীন গ্রীস (প্রায় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): হিপোক্রেটিস, যাকে "আধুনিক চিকিৎসার জনক" বলা হয়, তিনিই প্রথম "কার্সিনোস" (carcinos) শব্দটি ব্যবহার করেন, যার অর্থ গ্রীক ভাষায় "কাঁকড়া"। টিউমারের শিরাগুলোর সাথে কাঁকড়ার পায়ের সাদৃশ্য দেখে তিনি এই নামটি দিয়েছিলেন। হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে টিউমার, বিশেষ করে ক্যান্সার, শরীরের চারটি প্রধান তরল বা হিউমারের (humors) ভারসাম্যহীনতা, বিশেষ করে কালো পিত্তের আধিক্যের কারণে হয়।

(ঘ) রোমান সাম্রাজ্য: রোমান চিকিৎসক সেলসাস (Celsus) (১ম শতক খ্রিস্টাব্দ) গ্রীক শব্দ "কার্সিনোস" কে ল্যাটিন ভাষায় "ক্যান্সার" (cancer) হিসেবে অনুবাদ করেন, যা আজও ব্যবহৃত হয়। তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের টিউমারের জন্য সার্জারির পরামর্শ দেন। তবে, প্রভাবশালী রোমান সার্জন গ্যালেন (Galen) (২য় শতক খ্রিস্টাব্দ) হিপোক্রেটিসের হিউমার তত্ত্বকে সমর্থন করেন এবং মনে করতেন যে টিউমার সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা উচিত নয়, কারণ এতে কালো পিত্ত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। গ্যালেনের এই ধারণার কারণে প্রায় এক হাজার বছর ধরে টিউমার সার্জারির প্রচলন কমে যায়।

২. মধ্যযুগ ও রেনেসাঁস (৫০০ খ্রিস্টাব্দ - ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)

(ক) মধ্যযুগ: গ্যালেনের প্রভাব এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মধ্যযুগে টিউমারের চিকিৎসা পদ্ধতি তেমন এগোয়নি। টিউমারকে প্রায়শই অতিপ্রাকৃত বা দৈব শক্তি দ্বারা সৃষ্ট বলে মনে করা হতো।
(খ) রেনেসাঁস ও জ্ঞানালোক: রেনেসাঁস যুগে মানবদেহের ব্যবচ্ছেদ করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন সম্পর্কে নতুন জ্ঞান অর্জিত হয়। ১৬শ শতকে ভেসালিয়াস (Vesalius) এর মতো অ্যানাটোমিস্টরা রোগের স্থানীয়ীকরণের উপর জোর দেন, যা হিউমার তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করে।
(গ) ১৭শ ও ১৮শ শতক: এই সময়ে টিউমারের স্থানীয় উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা বিকশিত হতে থাকে।
(ঘ) পারসিভাল পট (Percivall Pott) (১৭৭৫): এই ইংরেজ সার্জন চিমনি সুইপারদের মধ্যে স্ক্রোটাল ক্যান্সারের উচ্চ হার পর্যবেক্ষণ করেন এবং চিমনির কালিকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটিই ছিল পরিবেশগত কার্সিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) চিহ্নিত করার প্রথম প্রমাণগুলির মধ্যে একটি। এটি বোঝাতে সাহায্য করে যে টিউমার শুধু অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যহীনতা নয়, বরং বাহ্যিক কারণ দ্বারাও প্রভাবিত হতে পারে। মাইক্রোস্কোপের ব্যবহারও এই সময়ে টিউমার কোষের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।

৩. আধুনিক টিউমার চিকিৎসার ভিত্তি স্থাপন (১৮০০ - ১৯০০)

(ক) কোষ তত্ত্বের বিকাশ: ১৯শ শতকে রুডলফ ভার্চো (Rudolf Virchow) এর মতো বিজ্ঞানীরা কোষ তত্ত্বের বিকাশ ঘটান, যা বলে যে সমস্ত জীবন্ত জিনিস কোষ দ্বারা গঠিত এবং নতুন কোষ বিদ্যমান কোষ থেকে আসে। এটি টিউমারকে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হিসাবে বুঝতে সাহায্য করে।
(খ) সার্জারির পুনরুত্থান: অ্যানাটমি এবং জীবাণু তত্ত্বের (Germ Theory) অগ্রগতির সাথে সার্জারি টিউমার চিকিৎসার জন্য আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এনেস্থেশিয়া এবং অ্যান্টিসেপটিক পদ্ধতির উন্নতির ফলে সার্জনরা নিরাপদে টিউমার অপসারণ করতে সক্ষম হন।
(গ) উইলিয়াম স্টুয়ার্ট হ্যালস্টেড (William Stewart Halsted): ১৯শ শতকের শেষের দিকে তিনি স্তন টিউমারের (ক্যান্সার) চিকিৎসার জন্য র‍্যাডিক্যাল মাস্টেক্টমি (radical mastectomy) পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এই পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে পার্শ্ববর্তী টিস্যু, পেশী এবং লিম্ফ নোড অপসারণ করা হতো। যদিও পরবর্তীতে এটি অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বলে বিবেচিত হয়, এটি টিউমার সার্জারির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।
(ঘ) প্রথম কেমোথেরাপির চেষ্টা: যদিও প্রাথমিক কার্যকারিতা সীমিত ছিল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে টিউমারের চিকিৎসা করার প্রাথমিক প্রচেষ্টা শুরু হয়।

৪. ২০শ শতকে টিউমার/ক্যান্সার গবেষণায় বিপ্লব

২০শ শতক টিউমার গবেষণা এবং চিকিৎসায় ব্যাপক অগ্রগতি নিয়ে আসে।

(ক) রেডিয়েশন থেরাপির আবিষ্কার (১৯০০ এর দশক): মেরি কুরি এবং পিয়ের কুরি তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পর, বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন যে বিকিরণ টিউমার কোষ ধ্বংস করতে পারে। ১৯০০ এর দশকের প্রথম দিকে রেডিয়েশন থেরাপি টিউমারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
(খ) কেমোথেরাপির বিকাশ (১৯৪০ এর দশক): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলে প্রথম কেমোথেরাপির ওষুধ তৈরি হয়। এটি টিউমার কোষ ধ্বংস করতে পারতো।
(গ) হরমোন থেরাপি (১৯৭০ এর দশক): বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে কিছু টিউমার (যেমন স্তন এবং প্রোস্টেট টিউমার) হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটি হরমোন থেরাপির বিকাশের পথ খুলে দেয়।
(ঘ) টিউমার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা: বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা টিউমারের কারণ, প্রতিরোধ, নির্ণয় এবং চিকিৎসার গবেষণায় বিশাল অবদান রাখে।
(ঙ) জিন তত্ত্বের অগ্রগতি: ডিএনএ গঠন আবিষ্কার এবং জেনেটিক্সের অগ্রগতির ফলে টিউমারের আণবিক ভিত্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জিত হয়। অনকোজিন (oncogenes) এবং টিউমার সাপ্রেসর জিন (tumor suppressor genes) আবিষ্কার টিউমারের বিকাশে জিনের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা দেয়।

৫. ২১শ শতক: নির্ভুলতা এবং লক্ষ্যযুক্ত চিকিৎসা

২১শ শতকে টিউমার/ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, বিশেষ করে জেনোমিক্স এবং ইমিউনোলজির ক্ষেত্রে অগ্রগতির কারণে।

(ক) টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy): এই ওষুধগুলো টিউমার কোষের নির্দিষ্ট আণবিক পথ বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, যখন সুস্থ কোষগুলোকে কম প্রভাবিত করে। এটি বিশেষ করে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের চিকিৎসায় কার্যকর।
(খ) ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): এই চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে টিউমার কোষকে চিনতে এবং ধ্বংস করতে উৎসাহিত করা হয়।
(গ) জেনোমিক্স এবং পার্সোনালাইজড মেডিসিন (Genomics and Personalized Medicine): টিউমারের জেনেটিক গঠন বিশ্লেষণ করে রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়।
(ঘ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিগ ডেটা: এই প্রযুক্তিগুলি টিউমারের গবেষণা, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

Export to Sheets