প্রিক্যান্সারাস টিউমার বলতে কোষের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বোঝায় যা এখনো পুরোপুরি ক্যান্সার (ম্যালিগন্যান্ট) হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ভবিষ্যতে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ধরনের অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিকে সাধারণত ডিসপ্লাসিয়া (Dysplasia) বা কার্সিনোমা ইন সিটু (Carcinoma in situ) নামেও অভিহিত করা হয়।
(১) কোষের অস্বাভাবিকতা: প্রিক্যান্সারাস কোষগুলো স্বাভাবিক কোষের চেয়ে কিছুটা আলাদা দেখায়। তাদের আকার, আকৃতি এবং বিন্যাসে পরিবর্তন আসে। তবে, এই পরিবর্তনগুলো এখনো এত গুরুতর নয় যে এদেরকে ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সার) বলা যায়।
(২) সীমিত বিস্তৃতি: প্রিক্যান্সারাস কোষগুলো শুধুমাত্র যে টিস্যু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তার উপরের স্তর বা এপিথেলিয়ামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এরা এখনো বেসমেন্ট মেমব্রেন (basement membrane) নামক পাতলা ঝিল্লি ভেদ করে ভেতরের টিস্যুতে আক্রমণ করেনি। এটাই এদেরকে ক্যান্সার থেকে আলাদা করে। যদি কোষগুলো বেসমেন্ট মেমব্রেন ভেদ করে ভেতরের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা ম্যালিগন্যান্ট (আক্রমণাত্মক ক্যান্সার) হয়ে যায়।
(৩) ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা: প্রিক্যান্সারাস টিউমারগুলো সবসময় ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয় না। কিছু ক্ষেত্রে, তারা স্থিতিশীল থাকতে পারে, বা এমনকি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেও যেতে পারে। তবে, কিছু প্রিক্যান্সারাস অবস্থা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয় এবং তাদের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
(৪) কোনো লক্ষণ না থাকা: অনেক প্রিক্যান্সারাস টিউমারের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ থাকে না এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষার (যেমন প্যাপ স্মিয়ার, কলোনোস্কোপি) সময় ঘটনাক্রমে ধরা পড়ে।
প্রিক্যান্সারাস পরিবর্তনগুলোকে সাধারণত তাদের অস্বাভাবিকতার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়:
(১) ডিসপ্লাসিয়া (Dysplasia): এটি কোষের অস্বাভাবিকতার একটি পর্যায়। ডিসপ্লাসিয়াকে হালকা (mild), মাঝারি (moderate) বা গুরুতর (severe) এই তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
(৩) মাঝারি ডিসপ্লাসিয়া: কোষের অস্বাভাবিকতা কিছুটা বেশি। ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা হালকা ডিসপ্লাসিয়ার চেয়ে বেশি।
(৪) গুরুতর ডিসপ্লাসিয়া: কোষের অস্বাভাবিকতা খুব বেশি এবং এটি প্রায় ক্যান্সারের কাছাকাছি। এদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
(৪) কার্সিনোমা ইন সিটু (Carcinoma in situ - CIS): এই অবস্থায় কোষগুলো এতটাই অস্বাভাবিক হয় যে তাদের ক্যান্সার কোষের মতো দেখায়, কিন্তু তারা এখনো তাদের উৎপত্তিস্থল টিস্যুর বেসমেন্ট মেমব্রেন ভেদ করে বাইরে ছড়ায়নি। যেহেতু এটি এখনো আক্রমণাত্মক হয়নি, তাই একে "ইন সিটু" (in situ - "মূল স্থানেই") বলা হয়। কার্সিনোমা ইন সিটুকে প্রায়শই ক্যান্সারের পর্যায় 0 (Stage 0) হিসেবে ধরা হয়। যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি প্রায় নিশ্চিতভাবে আক্রমণাত্মক ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।
শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের প্রিক্যান্সারাস অবস্থা দেখা যেতে পারে:
১. সার্ভিকাল ডিসপ্লাসিয়া/কার্সিনোমা ইন সিটু (Cervical Dysplasia/CIS): জরায়ুমুখের কোষে
অস্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত প্যাপ স্মিয়ার (Pap Smear) পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়। এটি হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV)
সংক্রমণের কারণে হয়। যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি আক্রমণাত্মক জরায়ুমুখের ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।
২. কোলন পলিপস (Colon Polyps): কোলন বা বৃহদন্ত্রের ভেতরের আস্তরণে তৈরি হওয়া ছোট বৃদ্ধি। কিছু পলিপ, বিশেষ করে
অ্যাডেনোমাটাস পলিপ (adenomatous polyps), প্রিক্যান্সারাস হতে পারে এবং সময়ের সাথে সাথে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।
কলোনোস্কোপির মাধ্যমে এগুলো সনাক্ত ও অপসারণ করা হয়।
৩. অ্যাক্টিনিক কেরাটোসিস (Actinic Keratosis): সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসা ত্বকে তৈরি হওয়া রুক্ষ, আঁশযুক্ত প্যাচ। এটি
স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামক এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সারের প্রিক্যান্সারাস অবস্থা।
৪. বেরেট'স ইসোফেগাস (Barrett's Esophagus): যখন খাদ্যনালীর নিচের দিকের কোষগুলো পাকস্থলীর কোষের মতো পরিবর্তিত
হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বা বুক জ্বালাপোড়ার কারণে হয়। এটি অ্যাডেনোকার্সিনোমা নামক খাদ্যনালীর
ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. ডুকটাল কার্সিনোমা ইন সিটু (Ductal Carcinoma in situ - DCIS): স্তন ক্যান্সারের একটি প্রাথমিক রূপ, যেখানে অস্বাভাবিক
কোষগুলো স্তন নালীর (ducts) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাইরে ছড়ায়নি। এটি আক্রমণাত্মক স্তন ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা।
প্রিক্যান্সারাস টিউমার নির্ণয় এবং চিকিৎসা সাধারণত ক্যান্সারের বিস্তার রোধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) স্ক্রিনিং পরীক্ষা: নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষা (যেমন প্যাপ স্মিয়ার, ম্যামোগ্রাম, কলোনোস্কোপি)
প্রিক্যান্সারাস অবস্থা সনাক্ত করতে সহায়ক।
(খ) বায়োপসি: সন্দেহজনক এলাকার টিস্যু নমুনা নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে ডিসপ্লাসিয়া বা কার্সিনোমা ইন সিটুর
উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
প্রিক্যান্সারাস অবস্থার চিকিৎসা বিভিন্ন কারণের উপর নির্ভর করে, যার মধ্যে অস্বাভাবিকতার মাত্রা, অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত।
(ক) পর্যবেক্ষণ (Watchful Waiting): যদি পরিবর্তনগুলো হালকা হয় এবং ঝুঁকি কম থাকে, তাহলে ডাক্তার
শুধু নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিতে পারেন।
(খ) অপসারণ (Removal): বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, প্রিক্যান্সারাস টিস্যুগুলো অস্ত্রোপচার, লেজার থেরাপি, ক্রায়োথেরাপি (ঠান্ডা দিয়ে অপসারণ)
বা ইলেকট্রোকটারির (তাপ দিয়ে অপসারণ) মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা হয়, যাতে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
(গ) ঔষধ: কিছু ক্ষেত্রে, ক্যান্সার প্রতিরোধকারী ওষুধ (chemoprevention) ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রিক্যান্সারাস টিউমারগুলো জীবন-হুমকি
না হলেও, এগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত এবং একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে
সনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা ভবিষ্যত ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।