মহিলা বন্ধ্যাত্ব বলতে বোঝায় যখন একজন মহিলা নিয়মিত ও অরক্ষিত যৌন মিলনের এক বছর চেষ্টা করার পরেও গর্ভধারণ করতে পারেন না। সাধারণত মহিলা বন্ধ্যাত্বকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, এবং এর পাশাপাশি বন্ধ্যাত্বের কারণের উপর ভিত্তি করেও বিভিন্ন ধরন থাকে।
প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব হলো যখন একজন মহিলা জীবনে একবারও গর্ভধারণ করেননি, এবং এক বছর ধরে নিয়মিত অরক্ষিত সহবাসের পরেও তিনি গর্ভধারণে ব্যর্থ হন। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ছয় মাস ধরা হয়।
সেকেন্ডারি বন্ধ্যাত্ব হলো যখন একজন মহিলা এর আগে অন্তত একবার গর্ভধারণ করেছেন (যে কোনো ফলাফল, যেমন সফল জন্ম, গর্ভপাত, বা একটোপিক প্রেগন্যান্সি), কিন্তু বর্তমানে তিনি আবার গর্ভবতী হতে পারছেন না।
উপরোক্ত দুটি মূল ভাগ ছাড়াও, বন্ধ্যাত্বের কারণের ওপর ভিত্তি করে এটিকে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা হয়:
এটি মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলে ডিম্বাশয় থেকে নিয়মিত
ডিম্বাণু নির্গত হয় না। এর কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো:
(ক) পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS): এটি একটি হরমোনজনিত সমস্যা যা ডিম্বাশয়ে ছোট
সিস্ট তৈরি করে এবং ডিম্বস্ফোটনে বাধা দেয়।
(খ) হাইপোথ্যালামিক ডিসফাংশন: মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস থেকে হরমোনের সমস্যা হলে
ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হতে পারে।
(গ) প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ইনসাফিসিয়েন্সি (POI): ডিম্বাশয় ৪০ বছর বয়সের আগেই সঠিকভাবে
কাজ করা বন্ধ করে দিলে এই সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে ডিম্বাণুর উৎপাদন কমে যায়।
(ঘ) থাইরয়েড সমস্যা: থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিকতা ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
(ঙ) হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়া: রক্তে অতিরিক্ত প্রোল্যাকটিন হরমোনের উপস্থিতিও ডিম্বস্ফোটনে বাধা
দিতে পারে।
ফ্যালোপিয়ান টিউব ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু জরায়ুতে নিয়ে আসে। এই টিউবগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ
হয়ে গেলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পারে না অথবা নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না। এর কারণগুলো হলো:
(ক) পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID): এটি সাধারণত যৌনবাহিত রোগের কারণে হয় এবং
ফ্যালোপিয়ান টিউবে সংক্রমণ ও দাগ তৈরি করে।
(খ) এন্ডোমেট্রিওসিস: জরায়ুর টিস্যু জরায়ুর বাইরে (যেমন ফ্যালোপিয়ান টিউবে বা ডিম্বাশয়ে) বেড়ে উঠলে
এটি টিউবগুলোকে ব্লক করতে পারে বা ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করতে পারে।
(গ) আগের অস্ত্রোপচার: পেটের বা পেলভিসের পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের কারণে ফ্যালোপিয়ান টিউবে দাগ
তৈরি হতে পারে।
জরায়ু ও জরায়ুমুখের গঠনগত অস্বাভাবিকতা বা অন্য কোনো সমস্যা গর্ভধারণে বাধা দিতে পারে।
(ক) জরায়ু ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroids): জরায়ুর মাংসপেশিতে সৃষ্ট টিউমার যা গর্ভধারণ বা গর্ভধারণের পর ভ্রূণের বিকাশে বাধা দিতে পারে।
(খ) জরায়ুর অস্বাভাবিক আকার (Uterine Anomalies): জন্মগত ত্রুটির কারণে জরায়ুর আকার অস্বাভাবিক হলে তা বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।
(গ) অ্যাডহেশনস বা আঠালোতা: জরায়ুর ভেতরের অংশে দাগ বা আঠালোতা (যেমন Asherman's Syndrome) থাকলে ভ্রূণের রোপণে সমস্যা হতে পারে।
(ঘ) জরায়ুমুখের স্টেনোসিস বা শ্লেষ্মার সমস্যা: জরায়ুমুখ খুব সরু হলে বা সঠিক পরিমাণে শ্লেষ্মা তৈরি না হলে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মহিলাদের ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান হ্রাস পায়, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
কিছু ক্ষেত্রে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরেও বন্ধ্যাত্বের কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি 'অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্ব' হিসেবে পরিচিত। এই ক্ষেত্রে দম্পতি এবং চিকিৎসকের জন্য কারণ খুঁজে বের করা এবং চিকিৎসা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। মহিলা বন্ধ্যাত্ব একটি জটিল বিষয় এবং এর কারণ বহুবিধ হতে পারে। সঠিক কারণ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য একজন অভিজ্ঞ প্রজনন বিশেষজ্ঞের (Fertility Specialist) পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।