কিছু ক্ষেত্রে, সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরেও বন্ধ্যাত্বের কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে
পাওয়া যায় না। এটি 'অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্ব' হিসেবে পরিচিত। এই ক্ষেত্রে দম্পতি এবং চিকিৎসকের জন্য কারণ খুঁজে বের করা
এবং চিকিৎসা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। "অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্ব" (Unexplained Infertility) একটি অত্যন্ত হতাশাজনক
পরিস্থিতি হতে পারে, কারণ এখানে সমস্ত প্রচলিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরেও বন্ধ্যাত্বের কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
যখন কোনো দম্পতি নিয়মিত এবং অসুরক্ষিত যৌন মিলনের পরেও (সাধারণত এক বছর, অথবা ৩৫ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের ক্ষেত্রে ৬ মাস) গর্ভধারণে ব্যর্থ হন এবং তাদের সমস্ত প্রজনন পরীক্ষা (যেমন, ডিম্বস্ফোটন পরীক্ষা, ফ্যালোপিয়ান টিউবের পরীক্ষা, জরায়ু পরীক্ষা এবং পুরুষের বীর্য বিশ্লেষণ) স্বাভাবিক ফলাফল দেখায়, তখন এই অবস্থাকে অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্ব বা Idiopathic Infertility বলা হয়। এই রোগ নির্ণয়টি মূলত "অন্যান্য কারণ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে" (diagnosis of exclusion) করা হয়, অর্থাৎ, যখন কোনো সুস্পষ্ট শারীরিক বা কার্যকরী কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
যদিও এর কোনো নিশ্চিত কারণ নেই, বিজ্ঞানীরা এবং চিকিৎসকরা কিছু সম্ভাব্য কারণ অনুমান করেন যা প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। এই কারণগুলো বেশ সূক্ষ্ম এবং নির্ণয় করা কঠিন।
(ক) ডিম্বাণুর গুণগত মান: ডিম্বাণুর সংখ্যা স্বাভাবিক থাকলেও
তার জেনেটিক গুণগত মান খারাপ হতে পারে। ক্রোমোজোমাল ত্রুটিযুক্ত ডিম্বাণু নিষিক্ত হলেও ভ্রূণ সঠিকভাবে বিকশিত
হতে পারে না। এই ধরনের সমস্যা প্রচলিত আল্ট্রাসাউন্ড বা হরমোন পরীক্ষায় ধরা পড়ে না।
(খ) শুক্রাণুর সূক্ষ্ম সমস্যা: বীর্য বিশ্লেষণে শুক্রাণুর সংখ্যা, আকার এবং গতি স্বাভাবিক
দেখালেও শুক্রাণুর মধ্যে ডিএনএ-এর (DNA) ক্ষতি থাকতে পারে। এই ধরনের ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন পরীক্ষা (DNA
fragmentation test) নিয়মিত বন্ধ্যাত্ব পরীক্ষার অংশ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ-যুক্ত শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে
পারলেও সুস্থ ভ্রূণ তৈরি করতে পারে না।
ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু একে অপরের কাছে পৌঁছালেও তাদের মধ্যে নিষেক (fertilization) প্রক্রিয়া সফল নাও হতে পারে। শুক্রাণু ডিম্বাণুর বাইরের আবরণ ভেদ করতে না পারা বা নিষিক্ত ডিম্বাণু বিভাজিত হতে না পারার মতো সমস্যা থাকতে পারে, যা শরীরের ভেতরে স্বাভাবিক অবস্থায় বোঝা যায় না।
ফ্যালোপিয়ান টিউব খোলা থাকলেও তার ভেতরের সিলিয়া (cilia) নামক ক্ষুদ্র চুলের মতো অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে। এই সিলিয়াগুলো ডিম্বাণুকে জরায়ুর দিকে ঠেলে দেয়। যদি তাদের গতি কমে যায় বা তারা ঠিকমতো কাজ না করে, তবে ডিম্বাণু বা নিষিক্ত ভ্রূণ জরায়ুতে পৌঁছাতে পারে না।
(ক) নিষিক্ত ভ্রূণ জরায়ুর ভেতরের আস্তরণে (Endometrium) সঠিকভাবে প্রতিস্থাপিত না হতে পারে।
যদিও জরায়ুর গঠন স্বাভাবিক থাকে, তবে এন্ডোমেট্রিয়ামের রিসেপটিভিটি বা গ্রহণ ক্ষমতা নিয়ে সূক্ষ্ম সমস্যা থাকতে পারে, যা ভ্রূণকে
আটকে রাখতে ব্যর্থ হয়।
(খ) রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunological Factors): শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (immune system) ভুলবশত ভ্রূণকে
বহিরাগত মনে করে আক্রমণ করতে পারে, যার ফলে প্রতিস্থাপন ব্যর্থ হয়।
হালকা বা মৃদু এন্ডোমেট্রিওসিস-এর লক্ষণ প্রায়শই প্রচলিত আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। এর উপস্থিতি ডিম্বাণুর গুণগত মান বা পেলভিক অঙ্গের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কিছু দম্পতি ডিম্বস্ফোটনের সঠিক সময় না বুঝেই যৌন মিলন করেন। ডিম্বাণু সাধারণত ডিম্বস্ফোটনের পর ২৪ ঘণ্টার জন্য নিষিক্ত হতে পারে। সঠিক সময় না জানলে বা পর্যাপ্ত ঘন ঘন যৌন মিলন না করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।
অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে চিকিৎসা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়, কারণ কোনো নির্দিষ্ট কারণ না থাকায়
চিকিৎসার লক্ষ্যও সুনির্দিষ্ট হয় না।
(ক) অপেক্ষা করা (Expectant Management): অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষত যদি দম্পতি তরুণ হন, চিকিৎসক এক
বছরের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। কারণ কিছু দম্পতির ক্ষেত্রে সময় পেরিয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে।
(খ) ওভুলেশন ইন্ডাকশন (Ovulation Induction): মুখে খাওয়ার ওষুধ (যেমন, Clomiphene Citrate বা Letrozole)
বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করে একাধিক ডিম্বাণু উৎপাদনে সাহায্য করা হয়, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়।
(গ) ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (IUI): এই পদ্ধতিতে ডিম্বস্ফোটনের সময় পুরুষের শুক্রাণু সংগ্রহ করে সরাসরি
জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। এটি শুক্রাণুকে জরায়ুমুখের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।
(ঘ) ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF): অজ্ঞাত বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে ডিম্বাণু
এবং শুক্রাণু শরীরের বাইরে ল্যাবে নিষিক্ত করা হয় এবং সুস্থ ভ্রূণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণ ক্ষমতা, ভ্রূণের
বিকাশ এবং জরায়ুর ভেতরে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়, যা অনেক সময় সমস্যার কারণ শনাক্ত করতেও সাহায্য করে।অজ্ঞাত
বন্ধ্যাত্ব একটি কঠিন নির্ণয় হলেও, অনেক দম্পতি সফল চিকিৎসার মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে সক্ষম হন। চিকিৎসকের সাথে খোলাখুলি আলোচনা
এবং সঠিক চিকিৎসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।