জরায়ু ও জরায়ুমুখের সমস্যাগুলো গর্ভধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
একটি সুস্থ জরায়ু ভ্রূণের সঠিক প্রতিস্থাপনের জন্য অপরিহার্য, এবং জরায়ুমুখ শুক্রাণুকে জরায়ুতে প্রবেশ করতে ও ডিম্বাণুর
কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
জরায়ু ও জরায়ুমুখের সমস্যাগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
কিছু মহিলা জন্মগতভাবে জরায়ুর অস্বাভাবিক গঠন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এই
ধরনের অস্বাভাবিকতাগুলো ভ্রূণের সঠিক প্রতিস্থাপন এবং বৃদ্ধিকে কঠিন করে তোলে।
(ক) সেপ্টেট জরায়ু (Septate Uterus): এটি সবচেয়ে সাধারণ জন্মগত অস্বাভাবিকতা।
এই অবস্থায় জরায়ুর ভেতরে একটি দেয়াল (septum) থাকে, যা জরায়ুকে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে দুটি ভাগে বিভক্ত
করে দেয়। এই দেয়ালটি রক্ত সরবরাহহীন বা খুবই কম রক্ত সরবরাহ পায়, যার ফলে ভ্রূণ এখানে প্রতিস্থাপিত হলে
সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না এবং গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
(খ) বাইকর্নুয়েট জরায়ু (Bicornuate Uterus): এই ক্ষেত্রে জরায়ু দেখতে হৃদপিণ্ডের মতো
হয় এবং এর দুটি "হর্ন" বা শাখা থাকে। এর ফলে গর্ভধারণ হলেও গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়, কারণ ভ্রূণের বৃদ্ধির
জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।
(গ) ডাইডেলফিক জরায়ু (Didelphys Uterus): এই অবস্থায় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জরায়ু,
জরায়ুমুখ এবং যোনি থাকতে পারে।
(ঘ) আর্কুয়েট জরায়ু (Arcuate Uterus): জরায়ুর ওপরের অংশে হালকা বাঁক বা বক্রতা
থাকে। এটি সাধারণত উর্বরতার উপর খুব বেশি প্রভাব ফেলে না, তবে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(ক) জরায়ু ফাইব্রয়েডস (Uterine Fibroids): ফাইব্রয়েডস হলো
জরায়ুর পেশীতে হওয়া নন-ক্যান্সারাস বৃদ্ধি। ফাইব্রয়েডের আকার এবং অবস্থানের উপর নির্ভর করে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
(খ) সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েডস (Submucosal Fibroids): যদি ফাইব্রয়েডস জরায়ুর ভেতরের
আস্তরণে (endometrium) বা তার কাছাকাছি জন্মায়, তবে এটি ভ্রূণ প্রতিস্থাপনে বাধা দিতে পারে এবং গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।
(গ) বড় ইন্ট্রামিউরাল বা সাবসেরোসাল ফাইব্রয়েডস (Large Intramural or Subserosal Fibroids):
বড় ফাইব্রয়েডসগুলো জরায়ুর আকৃতি পরিবর্তন করে দিতে পারে বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের প্রবেশপথকে ব্লক করে দিতে পারে, যা
শুক্রাণুর চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে।
(ঘ) জরায়ু পলিপস (Uterine Polyps): পলিপস হলো এন্ডোমেট্রিয়ামের (জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ)
অতিরিক্ত বৃদ্ধি, যা আঙ্গুরের মতো আকৃতিতে ঝুলে থাকে। এগুলি সাধারণত নন-ক্যান্সারাস। পলিপস শুক্রাণুর চলাচলকে বাধা দিতে
পারে বা ভ্রূণের প্রতিস্থাপনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
আগের কোনো জরায়ু সার্জারি (যেমন, D&C - Dilatation and Curettage), সংক্রমণ বা এন্ডোমেট্রিয়াল ইনজুরি থেকে জরায়ুর ভেতরে দাগ বা আঠালো টিস্যু (adhesions) তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাকে অ্যাশারম্যান সিন্ড্রোম (Asherman's Syndrome) বলা হয়। এই আঠালো টিস্যুগুলো জরায়ুর ভেতরের স্থানকে সংকুচিত করে দেয় এবং এন্ডোমেট্রিয়ামকে পাতলা করে দেয়, যা ভ্রূণের প্রতিস্থাপনের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে বন্ধ্যাত্ব বা বারবার গর্ভপাত হতে পারে।
জরায়ুমুখের ভূমিকা হলো শুক্রাণুকে যোনি থেকে জরায়ুতে প্রবেশ করতে সাহায্য করা।
জরায়ুমুখের কোনো সমস্যা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
(ক) জরায়ুমুখের সংকীর্ণতা (Cervical Stenosis): জরায়ুমুখের মুখ যদি অস্বাভাবিকভাবে সরু বা
বন্ধ থাকে, তবে এটি শুক্রাণুকে জরায়ুতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এটি জন্মগতভাবে হতে পারে বা কোনো পূর্ববর্তী সার্জারি
(যেমন, LEEP বা কোনাইজেশন) বা সংক্রমণের কারণেও হতে পারে।
(খ) জরায়ুমুখের শ্লেষ্মার সমস্যা (Cervical Mucus Problems): ডিম্বস্ফোটনের (ovulation)
সময় জরায়ুমুখ একটি বিশেষ ধরনের শ্লেষ্মা (cervical mucus) তৈরি করে, যা শুক্রাণুর জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ
তৈরি করে এবং তাদের জরায়ুতে চলাচল সহজ করে। যদি এই শ্লেষ্মা পর্যাপ্ত পরিমাণে না হয় বা তার গুণগত মান খারাপ
থাকে (যেমন, খুব ঘন হয়), তবে এটি শুক্রাণুর জন্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা তাদের জীবনকাল কমিয়ে দিতে পারে।
(গ) অ্যান্টি-স্পার্ম অ্যান্টিবডি (Anti-Sperm Antibodies): কিছু ক্ষেত্রে, মহিলার শরীর
শুক্রাণুকে আক্রমণ করার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডিগুলো জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় উপস্থিত থাকতে
পারে এবং শুক্রাণুকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। এই সমস্ত সমস্যাগুলো সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য সাধারণত
আল্ট্রাসাউন্ড, হিস্টেরোসালপিঙ্গোগ্রাম (HSG), হিস্টেরোস্কোপি বা এমআরআই-এর মতো পরীক্ষা করা হয়।
কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার পদ্ধতি ভিন্ন হয়, যেমন সার্জারির মাধ্যমে ফাইব্রয়েড বা পলিপ
অপসারণ, অ্যাশেরম্যান সিন্ড্রোমের চিকিৎসা বা IVF-এর মতো সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহার করা।