বয়স বাড়ার সাথে সাথে মহিলাদের ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান হ্রাস পায়, যা গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ডিম্বাণুর গুণগত মান বা সংখ্যাগত সমস্যার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
মহিলাদের উর্বরতা বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। একজন
মহিলা নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, যা তার সারা জীবনের জন্য যথেষ্ট। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু
করে, প্রতি মাসে ঋতুচক্রের সময় কিছু ডিম্বাণু পরিপক্ক হয় এবং একটি ডিম্বাণু নির্গত হয়। বাকি ডিম্বাণুগুলো নষ্ট
হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় ডিম্বাণুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
(ক) সংখ্যার হ্রাস (Decreased Quantity): একজন মহিলার বয়স বাড়ার সাথে সাথে
ডিম্বাশয়ে থাকা ডিম্বাণুর মোট সংখ্যা (Ovarian Reserve) কমতে থাকে। সাধারণত ৩৫ বছর বয়সের পর থেকে
ডিম্বাণুর সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। ৪০ বছরের পর এই সংখ্যা আরও কমে যায়, যা গর্ভধারণকে অনেক
কঠিন করে তোলে।
(খ) গুণগত মানের অবনতি (Decreased Quality): শুধু সংখ্যা নয়, বয়স বাড়ার সাথে
সাথে ডিম্বাণুর গুণগত মানও কমে যায়। এর প্রধান কারণ হলো ডিম্বাণুর জেনেটিক উপাদানে (ক্রোমোজোমে)
অস্বাভাবিকতা বৃদ্ধি। পুরোনো ডিম্বাণুগুলোর মধ্যে ক্রোমোজোমাল ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই ত্রুটিপূর্ণ
ডিম্বাণু থেকে নিষেক হলেও ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কিছু মহিলার ক্ষেত্রে, ডিম্বাশয় স্বাভাবিক বয়সের আগেই ডিম্বাণু উৎপাদন এবং কার্যকারিতা
হারায়। এই অবস্থাকে প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিউর (Premature Ovarian Failure - POF) বা প্রাথমিক
ডিম্বাশয় অপর্যাপ্ততা বলা হয়। এটি সাধারণত ৪০ বছর বয়সের আগে ঘটে। এর কারণগুলো হলো:
(ক) জেনেটিক কারণ: কিছু জেনেটিক অস্বাভাবিকতা (যেমন: টার্নার সিন্ড্রোম) ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা
নষ্ট করতে পারে।
(খ) অটোইমিউন রোগ: যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত ডিম্বাশয়ের টিস্যুকে আক্রমণ করে,
তখন এটি ডিম্বাশয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ডিম্বাণুর কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়।
(গ) চিকিৎসাজনিত কারণ: কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপির মতো ক্যান্সার চিকিৎসা ডিম্বাশয়কে
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
(ঘ) অজানা কারণ: অনেক সময় এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা PCOS হলো একটি হরমোনজনিত সমস্যা যা মহিলাদের প্রজনন
ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। PCOS-এ আক্রান্ত মহিলাদের ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট তৈরি হয় এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়।
(ক) ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা (Ovulation Issues): PCOS-এর একটি প্রধান লক্ষণ হলো অনিয়মিত
ডিম্বস্ফোটন বা ডিম্বস্ফোটন না হওয়া (anovulation)। এর ফলে ডিম্বাণু পরিপক্ক হয় না বা নিয়মিতভাবে নির্গত হয় না, যা
গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয়।
(খ) হরমোন ভারসাম্যহীনতা: ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন) এর উচ্চ
মাত্রার কারণে ডিম্বাণুর স্বাভাবিক পরিপক্কতা ব্যাহত হয়।
ডিম্বাণুর উৎপাদন এবং পরিপক্কতা বিভিন্ন হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে
নির্গত FSH এবং LH হরমোন ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করে। থাইরয়েড গ্রন্থি বা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির যেকোনো সমস্যা এই হরমোনগুলোর
কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে।
(ক) হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম: থাইরয়েডের সমস্যা ঋতুচক্র এবং ডিম্বস্ফোটনকে
অনিয়মিত করে দিতে পারে।
(খ) উচ্চ প্রোলাকটিন মাত্রা (High Prolactin levels): কিছু ক্ষেত্রে, প্রোলাকটিন হরমোনের মাত্রা
বেড়ে গেলে ডিম্বস্ফোটন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য রক্ত পরীক্ষা (যেমন: AMH, FSH),
ডিম্বাশয়ের আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য হরমোনের পরীক্ষা করা হয়। যদি ডিম্বাণুর গুণগত মান খুব খারাপ হয়, তবে অনেক সময় ইন-ভিট্রো
ফার্টিলাইজেশন (IVF) বা ডিম্বাণু ডোনেশনের মতো বিকল্পের প্রয়োজন হতে পারে।